চাঁদপুরে যে কারণে করোনার প্রকোপ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২০, ২৩:০৬

চাঁদপুরে কোভিড-১৯ রোগে এবং করোনা উপসর্গে মৃত্যু বেড়েছে। গত কয়েক দিনে করোনা উপসর্গ নিয়ে ৭১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে মৃত্যুর পরে পজিটিভ এসেছে ২৯ জনের। চিকিত্সক ও সংশ্লিষ্টরা বলেন, মানুষজনের মধ্যে সচেতনতার অভাব, স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং সময়মতো চিকিত্সকের পরামর্শ না নেওয়ার কারণেই করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। এছাড়া জেলার সর্বত্র প্রয়োজনীয় চিকিত্সা উপকরণ ও জনবল সংকটেও চিকিত্সা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

জানা গেছে, করোনার উপসর্গ দেখা দিলেও সে তথ্য গোপন করে বিভিন্ন পেশার লোকজন প্রকাশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া কোনো বাড়ির কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে ঐ বাড়ির বাকি সদস্যরা করোনা পরীক্ষা করায় না। অন্যরা আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত না হয়েই অনায়াসে হাটবাজারে চলাফেরা করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, চাঁদপুরের সঙ্গে নৌপথ, সড়কপথ এবং রেলপথে যেহেতু সারাদেশের সঙ্গে সুষ্ঠু যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, সেহেতু অতি সহজে অন্যজেলা থেকে করোনা আক্রান্ত রোগীরা চাঁদপুরে এসে করোনার বিস্তার ঘটাচ্ছে। কোনো বাসায় একজন বাইর থেকে এসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কয়েক দিন পর ঐ বাসার আরো দুই/এক জন আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এছাড়াও কোনো বাসায় এক জন করোনায় আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যরা কয়েক দিন একটু লবণ গরমপানি পান এবং বাষ্প নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয়েই বাইরে চলে যাচ্ছে। এসব কারণেই করোনার ব্যাপক বিস্তার ঘটছে।

জেলায় প্রথম থেকেই স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ সকল মহল করোনা নিয়ন্ত্রণে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।

মৃত্যু বৃদ্ধির পেছনে চিকিত্সাসেবার অপ্রতুলতারও কথা  শোনা যাচ্ছে। চাঁদপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে বর্তমানে যে কয়জন চিকিত্সক আছেন তারা দিনরাত সেবা দিচ্ছেন। এই হাসপাতালে করোনা টেস্ট করার জন্য কোনো পিসিআর ল্যাব নেই, নেই আইসিইউ, নেই ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা, নেই সেন্ট্রাল এসি। সময়মতো পাওয়া যায় না অক্সিজেন সিলিন্ডার। রোগীর চাপে পূর্বের ৩০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডটি ৬ জুন নিজস্ব প্রচেষ্টায় ৭০ বেডে উন্নিত করা হয়েছে। যে তিন জন নমুনা সংগ্রহকারী ছিলেন তারা করোনায় আক্রান্ত। অন্য স্থান থেকে তিন জন টেকনোলজিস্ট এনে এ কাজটি করানো হচ্ছে।

চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের কয়েক জন চিকিত্সক করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন আছেন। সদর উপজেলায় যে দুই জন টেকনোলজিস্ট কাজ করতেন তারাও আক্রান্ত। যার কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ বন্ধ রয়েছে। চাঁদপুরের বেসরকারি হসপিটালগুলো রোগী ভর্তি এবং সেবা দিচ্ছে না। এ কারণে সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি পড়ছে। আর হাসপাতালে গিয়ে সুষ্ঠু সেবা পাবে কি না তা নিয়েও সংশয় কাজ করছে রোগীদের মধ্যে।

চাঁদপুরে বর্তমানে আক্রান্ত ও মৃত্যু : গত শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় করোনায় শনাক্ত হয়েছে ৩৬৫ জনের। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩১ জন। সুস্থ হয়েছেন ৭৬ জন। জেলায় আক্রান্তদের মধ্যে চাঁদপুর সদরে ১৫৭ জন, ফরিদগঞ্জে ৪৮ জন, হাজীগঞ্জে ৪২ জন, মতলব দক্ষিণে ৩০ জন, কচুয়ায় ২২ জন, শাহরাস্তিতে ৩৪ জন, মতলব উত্তরে ১৬ জন এবং হাইমচর উপজেলায় ১৫ জন। এ পর্যন্ত চাঁদপুর সদরে মারা গেছেন ১০ জন, ফরিদগঞ্জে চার জন, হাজীগঞ্জে সাত জন, শাহরাস্তিতে তিন জন, কচুয়ায় চার জন, মতলব উত্তরে দুই জন ও মতলব দক্ষিণে এক জন।

সিভিল সার্জন ডা. মো. সাখওয়াত উল্লাহ জানান, এই পর্যন্ত ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ২৭৮৫টি রিপোর্ট। ২৩৯৬টি রিপোর্ট এসেছে। এর মধ্যে পজিটিভ রিপোর্ট ৩৫০ (দুই জনের রিপোর্ট দ্বিতীয়বার পজিটিভ এসেছে)। নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে ২০৪৬ জনের। শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষমাণ রিপোর্ট ৩৮৯টি। জেলায় চিকিত্সাধীন রোগী ২৬০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ১১ জন চিকিত্সা নিচ্ছেন। ঢাকায় পাঠানো হয়েছে চার জনকে। হোম আইসোলেশনে আছেন ২৪৫ জন। এই পর্যন্ত আইসোলেশনে রোগীর সংখ্যা ১৬৭ জন। আইসোলেশন থেকে ছাড়প্রাপ্ত রোগী সংখ্যা ১৫০ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে রোগীর সংখ্যা ১৭ জন। তিনি আরো জানান, এই পর্যন্ত জেলায় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তির সংখ্যা ৪৭০৯ জন। হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড়প্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৬৫১ জন। বর্তমানে জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১০৩৪ জন।