সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক ও খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নাসিম এমপি ছিলেন পঁচাত্তরে জেলখানায় হত্যাকাণ্ডের শিকার জাতীয় চার নেতার একজন শহিদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছেলে। মনসুর আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
মোহাম্মদ নাসিমের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই পার করেছেন নানা চড়াই-উতরাই। রাজনীতির হাতেখড়িটাও শৈশবেই। ছাত্রলীগ, যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগ। দেশের রাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায় জুড়ে ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় এম মনসুর আলী ও মোসাম্মত আমেনা মনসুরের ঘরে মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম। শহিদ এম মনসুর আলী ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। পিতার মতো তিনিও দেশের রাজনীতিতে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। নিজের ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে মোহাম্মদ নাসিম একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বুঝে অথবা না বুঝে যে কারণেই হোক আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতাম। ১৯৬৭ বা ৬৮ সালে পাবনায় এক জনসভা শেষে বঙ্গবন্ধু আমাদের বাসায় এলেন। খাওয়া-দাওয়ার এক পর্যায়ে আমাকে খুঁজলেন, বললেন—‘নাসিম কোথায়? আমি ভয়ে ভয়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই।’ তখন তিনি অত্যন্ত স্নেহ করে আমাকে বললেন, ‘তুই মনসুর আলীর ছেলে হয়ে ছাত্র ইউনিয়ন করিস।’ আমি ভয়ে ভয়ে বললাম—‘চাচা, আমি এখন থেকেই ছাত্রলীগ করব। এরপর আমি ছাত্রলীগ করি। যুবলীগ করেছি। এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে যাচ্ছি।’
রাজনীতিতে প্রায় ৬ দশক
মোহাম্মদ নাসিম জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর তিনি যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর ১৯৮১ সালের সম্মেলনে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুব সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮৭ সালে দলের প্রচার সম্পাদক হন মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালের সম্মেলনে পরপর দুই বার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। ঐ সময় দলে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ একটি ছিল। ২০০২ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে কার্যনির্বাহী কমিটির এক নম্বর সদস্য পদে ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। এরপর ২০১২ সালের সম্মেলনে তাকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন।
সংসদ ও সরকারে বারবার
১৯৮৬ সালে প্রথম সিরাজগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। ঐ একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে ছয় বার জাতীয় সংসদে আসেন তিনি। ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। মাঝে মামলার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ঐ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তার ছেলে তানভির শাকিল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী হন মোহাম্মদ নাসিম। পরের বছর আরো একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ডাক ও টেলিযোগাযোগের পাশাপাশি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। এরপর ১৯৯৯ সালে মন্ত্রিসভা রদবদল করা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোহাম্মদ নাসিমকে। এরপর ২০১৪ সালের সরকারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় তাকে রাখা হয়নি। অতীতে তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপের দায়িত্বও পালন করেন।
আন্দোলন ও কারাবাস
রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল মোহাম্মদ নাসিমের। সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন সময় নির্যাতন সহ্য করেছেন। আলোচিত এক-এগারো সরকারের সময়েও গেছেন কারাগারে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার বাবার মতোই বঙ্গবন্ধু পরিবারের আস্থাভাজন ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এর মাত্র আড়াই মাসের মাথায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার হন মোহাম্মদ নাসিম। এক-এগারো সরকারের দ্বিতীয় মাসেই আরো অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে গ্রেফতার হন মোহাম্মদ নাসিম; কিন্তু আওয়ামী লীগ ও জাতির পিতার রাজনীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন সবসময়ই আপসহীন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার কারণে তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনারও আস্থাভাজন ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের স্বৈরশাসন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ স্বাধীন বাংলাদেশে সব সামরিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি অনেক বার রাজপথে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন। ১৪ দলকে বর্তমানে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে তার বড়ো ভূমিকা রয়েছে? রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। সিরাজগঞ্জের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন হয়েছে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের হাত ধরে।
আমাদের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মোহাম্মদ নাসিম শুধু কাজিপুর উপজেলা নয়; তার উন্নয়নের ছোঁয়া পুরো সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া তথা গোটা উত্তরবঙ্গে লেগেছে। এসব জেলায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করার জন্য মোহাম্মদ নাসিম সংশ্লিষ্ট আসনের এমপিদের সহযোগিতা করেছেন। আবার প্রকল্প পাওয়ার জন্য ওপর মহলে তদবিরও করেছেন। যে কারণে এসব এলাকার মানুষ বলেন, মোহাম্মদ নাসিম উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের রূপকার।
২০১৮ সালে কাজিপুরে এক জনসভায় মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিগত পাঁচ বছরে কাজিপুরে ৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হয়েছে। এছাড়া গত পৌনে দুই বছরেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়।
