১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে স্প্যানিশ ফ্লুর প্রকোপ শুরু হয়। ক্যাম্পাসে বসবাসকারী সবাইকে ফেসমাস্ক ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়, ফুটবল ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। শিক্ষার্থীদের বলা হয় ক্যাম্পাসের মধ্যে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে। এসব কিছু হলেও ক্লাস কিন্তু বন্ধ হয়নি। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের অংশ হিসেবে ছাত্রদের জার্মান মেশিনগান এবং পয়জন গ্যাস ব্যবহারের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি।
এক মাসের মধ্যেই দেখা গেল এক দশমাংশ শিক্ষার্থী ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে মারাও যায় অনেকে। সানফ্রান্সিসকো শহরে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের ফ্লু ধরা পড়ে, এদের মধ্যে মারা যায় ৩ হাজার। কিন্তু এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে শুরু করে। খেলাধুলাসহ সিলেবাসের বাইরের আনুষ্ঠানিকতাগুলো যথারীতি শুরু হয়। যদি ফ্লু আরো পাঁচ ছয় মাস অব্যাহত গতিতে চলে। অবস্থাটি করোনাকালের একদম বিপরীত। স্ট্যানফোর্ডসহ ইউনিভার্সিটিগুলো এখন বন্ধ। শিক্ষার্থীদের অনলাইনে লেখাপড়া করতে বলা হচ্ছে। স্ট্যানফোর্ডের হাসপাতালটি সম্প্রতি ২ বিলিয়ন ডলার পুনর্নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার ১৪ হাজার স্টাফের বেতন এক পঞ্চমাংশ কমিয়ে দিতে হয়েছে। কারণ হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছে উদ্বিগ্ন রোগীরা। শহরটির লোকসংখ্যা ১০০ বছর আগে যা ছিল এখন তার দ্বিগুন। মে মাসের শেষ পর্যন্ত সেখানে ২ হাজার ৪০০ আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে ৪০ জন। মৃত্যুর হার আক্রান্তের দশমিক ৮ শতাংশ, যা ১০০ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লুর চেয়ে অনেক কম। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি থমথমে। দুই মাস ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসোম অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের ঘরে থাকতে বলেছেন। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারছে না।
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের কাহিনিটি একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। এ থেকে বোঝা যায় করোনা মহামারির ১০০ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লুর চেয়ে মানুষের মনে কতটা উত্কণ্ঠা তৈরি করেছে। এবার সারা বিশ্বে প্রাণহানির সংখ্যা ৩ লাখের মতো হলেও এটি মানুষের জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে প্রবলভাবে। কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়েছে। দুনিয়া জুড়ে ১৫০ শিক্ষার্থী (মোট বৈশ্বিক শিক্ষার্থীর ৯০ শতাংশ) শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বৈশ্বিক জিডিপিও ১৯৩০ এর দশকের মহামন্দার পরে এতটা নিম্নগামী আর কখনো হয়নি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হওয়ায় চোখে অন্ধকার দেখছে কোটি কোটি মানুষ।
স্প্যানিশ ফ্লুতে যুক্তরাষ্ট্রে মারা যায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ। তখনকার সময়ের জনসংখ্যা দশমিক ৫ শতাংশ। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়ায়নি। স্প্যানিশ ফ্লুতে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যু ছিল কম। কিন্তু করোনা ভাইরাস শিল্পোন্নত বা অনুন্নত কাউকে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে না। স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা যায় ৪ কোটি মানুষ, যা ঐ সময়ে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ। বর্তমান জনসংখ্যার হিসেবে শতাংশটি রূপান্তর করলে হবে ১৫ কোটি। যদিও বলা হচ্ছে করোনায় মৃতদের অধিকাংশের বয়স ৬০ এর ওপর। বাস্তবে সব বয়সের মানুষই মারা যাচ্ছে। এর ফলে পরিবারে, সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের ভারসাম্যহীন অবস্থা তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গেছে একজন মানুষ গড়পড়তা সারা জীবনে ১ কোটি ডলার আয় করতে পারে। অর্থাত্ মানুষের জীবনের মূল্য ১ কোটি ডলার। ১০০ বছর আগে যা ছিল একটি কল্পনামাত্র। এই হিসেবে এখন পর্যন্ত যত মানুষ মারা গেছে তার আর্থিক পরিমাণটি বিশাল এক অঙ্কে দাঁড়াবে। ১০০ বছরে মানুষ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিত্সা বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি করলেও করোনা মোকাবিলায় অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। উন্নত অনুন্নত কোনো দেশই এখনো পর্যন্ত আশারবাণী শোনাতে পারেনি। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন মানুষ ঘরে বসে কাজ করতে পারছে ঠিকই। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে তারাই কেবল তাদের কর্মীদের এ রকম সুযোগ দিতে পারছে। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার ফলে অবসাদ ও অন্যান্য মানসিক জটিলতা বাড়ছে। সামাজিক দূরত্বের ধারণাটি সমাজ ঠিক মতো ধারণ করতে পারেনি।
