আর কখনো অ্যাক্রোলিকের টিউব খুলবে কি না, ইজেলের ক্লিপে কাগজ লাগিয়ে রং চড়াবে কি না কিংবা ব্রাশের সঙ্গে ধুলোবালির বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ ঘটাবে কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় থাকারই কথা। গত এক বছর আবু সাদাত যেভাবে চলছে তাতে এরকম ভাবাটা অমূলক নয়। অতি আদরের একমাত্র সন্তান হয়েও মায়ের চক্ষুশূল হওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে সে। মায়ের অভিযোগও অগ্রাহ্য করার মতো নয়। বয়স হয়েছে বিয়ে করেনি। এক বছর যাবত্ কোনো কাজ করে না। সামান্য জমিজমা থেকে যা কিছু আসে তা দিয়ে দুজনের দুবেলা ভাত জুটলেও মায়ের স্বপ্নগুলো ধূসর হচ্ছে। সন্ধ্যার পর চারটে ভাত মুখে দিয়ে আবু সাদাত হাওয়া হয়ে যায়।
সুবোধ ছেলে হঠাত্ কেন এমন নিষ্কর্মা হয়ে বৃদ্ধা মায়ের যন্ত্রণার কারণ হলো? এর শেকড় খোঁজা উচিত বলে কথাকারের মনে হয়। আসলে ঘটনাটি সামান্য হলেও আবু সাদাতের জীবনে সবচেয়ে বড়ো আঘাত যা সে সহ্য করতে পারেনি। পাঁচ বছর আগে বিশজন তরুণ চিত্রশিল্পীর পেইন্টিং নিয়ে একটি ছবির এক্সিবিশন হয়েছিল। সেই এক্সিবিশন থেকে অনেক টাকা দামে এক শিল্পপতি আবু সাদাতের ‘অলীক আলোর রেখাপাত’ ছবিটি কিনেছিলেন। সেই উত্সাহে সে আরো কিছু কাজ করেছে। নতুন পেইন্টিং বিক্রির প্রত্যাশায় একটি ক্যাটালগ নিয়ে একদিন ঐ শিল্পপতির বাসায় যায় দেখা করতে। শিল্পপতি তাকে সন্ধ্যায় সময় দিলেও তিনি বাড়িতে থাকেননি। প্রাসঙ্গিক কথাবার্তায় দারোয়ানের সঙ্গে সামান্য খাতির হলে গেটের পাশে অপেক্ষা করার সুযোগ পায় সে। দারোয়ানের সঙ্গে সিগারেট ভাগাভাগি করেও খায়। এক সময় বাথরুমের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় গ্যারেজের পাশে বাথরুমে যাওয়ার সময় হঠাত্ চোখে পড়ে ভাঁড়ার ঘরে ‘অলীক আলোর রেখাপাত’ পড়ে আছে আবর্জনা স্তূপে। আর তখন তার পায়ের নিচ থেকে একটি হিমপ্রবাহ ধীরগতিতে করোটিতে গিয়ে স্থির হয়। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সে আর বোধ করেনি। ফিরে আসে বাসায় এবং রাতেই বাসায় তালা মেরে নৈশ কোচে গ্রামের বাড়িতে।
সন্ধ্যার পর অন্ধকার আলপথে ঘুরে বেড়ায়। ‘শিল্পীজীবন ব্যর্থ’ মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে বলে। আলপথে ঘুরে ক্লান্ত হলে বিস্তৃত মাঠের বুকের উপর দিয়ে যাওয়া নতুন সড়কের মাঝামাঝিতে একটি মাঝারি সাইজের ব্রিজের রেলিংয়ের পাশে শুয়ে থাকে জোছনারাতে। আর নৈঃশব্দ্যের ঘোরে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সৃষ্টিহীন, চিন্তাহীন, কর্মহীন জড় পদার্থের মতো জীবন যাপনে আবু সাদাতের নতুন জগত্ তৈরি হয়।
এক ধবল জোছনারাতে ব্রিজের রেলিং ঘেঁষে তন্দ্রাচ্ছন্ন শুয়ে আছে আবু সাদাত। ক্রমে রাত গভীর হলে হঠাত্ অনুমান করে তার পাশে কেউ একজন বসেছে। চোখ খুলে দেখে এক বৃদ্ধ লোক। অদ্ভুত রকমের পোশাক গায়ে, মুখে গোঁফ-দাড়িতে একাকার। হাতে হিজিবিজি কাগজপত্র। আবু সাদাত উঠে বসে। বৃদ্ধ লোকটি হাতের অর্ধ জলন্ত সিগারেট দিয়ে বলে, নে খা।
আবু সাদাতের মনে হলো লোকটি জনম জনম ধরে পরিচিত। সে বলে, বুঝেছিস শিল্পী, প্রতিটি কাজেরই প্রাণ আছে। প্রতিটি কাজই জীবন্ত।
আবু সাদাত চমকে ওঠে। লোকটি বলে কী? পাগল ছাড়া এই উদ্ভট কথা কেউ বলতে পারে না। লোকটি যেন আবু সাদাতের মনের কথাও শুনতে পায় এবং বলে, না, আমি পাগল নই। এই দ্যাখ।
লোকটি আবু সাদাতের ‘অলীক আলোর রেখাপাত’ ছবিটি বের করে ব্রিজের উপর রেখে বলে, তোর কাজের জন্য ঐ শিল্পপতি এই ছবি কেনেনি। তোকে টাকা দিয়ে সাহায্য করার জন্য এটি কিনেছিল। এই ছবিতে কোনো শিল্প নেই, আছে কিছু রঙের মাখামাখি।
লোকটি থামে এবং অদ্ভুত পোশাকের পকেট থেকে আরো একটি সিগারেট নিয়ে জ্বালায়। তারপর বলে, গাছ যেমন আজীবন ফল দেয় তেমনি একটি ভালো কাজও আজীবন ফল দেয়। খারাপ কাজগুলো আগাছার মতোই ধ্বংস হয়, মরে যায় কিংবা অভক্ষ্য ফল দেয়।
লোকটি সিগারেটে আরো দু’তিনটি টান দিয়ে আবু সাদাতের হাতে ধরিয়ে ধীরপায়ে চলে যায়। আবু সাদাত এতটাই বিমূঢ় হয়ে গেল যে, সে কোনো কথাই বলতে পারেনি। ধবল জোছনায় ব্রিজে পড়ে থাকা ‘অলীক আলোর রেখাপাত’-এর দিকে তাকিয়ে থাকে শান্ত হ্রদের মতো।
