পোশাকশিল্পের সাফল্যের পর বাংলাদেশের ঔষধশিল্প অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক খাত হিসাবে বিবেচিত হইতেছে। একসময় যেখানে প্রচুর টাকার ঔষধ আমদানি করা হইত, এখন সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ১৬০টি দেশে আমাদের ঔষধ রপ্তানি হইয়া থাকে। গত এক দশকে এই শিল্পে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়া গিয়াছে। এমনকি ঔষধ রপ্তানিকারক ৪৮টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশ রহিয়াছে শীর্ষস্থানে। এভাবে ঔষধশিল্প আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে যুগান্তকারী অবদান রাখিতেছে। তবে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর বিশ্বব্যাপী যে বহুমুখী সংকট দেখা দিয়াছে, তাহার ধাক্কায় বাংলাদেশের এই খাতও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে বইকি। ইতোমধ্যে খবর প্রকাশিত হইয়াছে যে, করোনা চিকিত্সায় ব্যবহূত কিছু কিছু ঔষধের মূল্য দ্বিগুণ, চার গুণ পর্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছে। যেমন—আইভেরা ৬ এমজি ট্যাবলেট এক প্যাকেট ৭৫০ টাকার বদলে ২ হাজার ৪০০ টাকা, স্ক্যাবো ৬ এমজি ট্যাবলেট ৫০ টাকার বদলে ৮০০ টাকা ও মোনাস ১০ এমজি ট্যাবলেট ৪৮০ টাকার বদলে ১ হাজার টাকায় বিক্রয় হইতেছে। জিংক, সিভিট, প্যারাসিটামল, নাপা, নাপা এক্সট্রা ইত্যাদি ঔষধের মূল্যও বাড়তি। নিউরোলজি, হার্ট, উচ্চ রক্তচাপ, বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস এমনকি অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহূত ঔষধও আছে এই বাড়তি মূল্যের তালিকায়।
ঔষধের মূল্য বৃদ্ধির পিছনে আসলে ঔষধ উত্পাদনকারীরা কতটুকু দায়ী? এখানে ফার্মেসি মালিকদের অভিযোগ, তাহারা ঔষধের সরবরাহ ঠিকমতো পাইতেছেন না। আবার ঔষধ উত্পাদনকারীরা বলিতেছেন অন্য কথা। তাহাদের অভিযোগ, করোনার কারণে পরিবহন ও কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়াছে। ফলে সকল ঔষধের নহে, বাড়িতেছে কিছু কিছু ঔষধের মূল্য। ইহার সহিত যোগ হইয়াছে একশ্রেণির ব্যবসায়ীর কারসাজি। বিশেষ করিয়া পাড়া-মহল্লায় ঔষধের মূল্য হাঁকা হইতেছে সবচাইতে অধিক। কোথাও কোথাও এই বলিয়া গুজব ছড়ানো হইতেছে যে, ইভেরা ও ডক্সিক্যাপ ট্যাবলেট সেবন করিলেই করোনা ভাইরাস খতম এবং ইহার আর কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। অমনি মানুষ হুমড়ি খাইয়া পড়িতেছে এই দুইটি ঔষধ ক্রয়ের জন্য। বগুড়ায় ঘটিয়াছে এমন ঘটনা। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী শহরেও ঔষধের মূল্যে পরিলক্ষিত হইতেছে উত্তাপ। শুধু ঔষধ নহে, করোনা দুর্যোগকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় হইয়া দেখা দেওয়া সার্জিক্যাল মাস্কসহ অন্যান্য মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, জীবাণুনাশক স্যাভলন, ডেটল, দেহে অক্সিজেনের মাত্রামাপক অক্সিমিটার ইত্যাদির মূল্যও হাঁকা হইতেছে ইচ্ছামতো। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ যাইবে কোথায়?
করোনা সংকটকে পুঁজি করিয়া যেই সকল অসাধু ব্যবসায়ী ঔষধ ও মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টের মূল্য অযথা ও অন্যায্যভাবে বাড়াইয়া দিতেছেন, তাহারা সঠিক কাজটি করিতেছেন না। এই ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মনিটরিং টিম ও একই মন্ত্রণালয়ের অধীন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যেই সকল ব্যবসায়ী মোড়কে লিখা মূল্যের চাইতে অনৈতিকভাবে ঔষধ ও ঔষধসামগ্রীর মূল্য বেশি চাহিবেন, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার হইলে ঔষধের বাজারের এই অস্থিরতা দূর হইতে পারে।
