করোনা ভাইরাসপ্রসূত ভয়ভীতি, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও কর্মের অপ্রতুলতার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী একটি সুখবর দিয়েছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিচারে তিনি আশান্বিত হয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছেন ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এ লক্ষ্যমাত্রা অনেকের কাছেই একটি অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা। অর্থমন্ত্রী অবশ্য শুধু ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নয়, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা, ব্যয়ের মাত্রা, বার্ষিক উন্নয়ন, কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তার নিজস্ব প্রত্যাশা বাজেট বক্তৃতায় প্রকাশ করেছেন। দেখা যাচ্ছে তার ব্যয় বাজেটের পরিমাণ হচ্ছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ এবং গেল অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা সর্বমোট ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড’ (এনবিআর) দেবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা গেল বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এনবিআর এই রাজস্ব আদায় করতে সম্ভব হবে কি না, সে সম্পর্কে তাদের কর্মীরা নিশ্চিত নন। এই মর্মে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পত্রও লিখেছেন। তারা ভারাক্রান্ত টার্গেটের চাপে, বিশাল ঘাটতির ফলে। ২০১৯-২০ সালে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা, আর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। জিডিপির অনুপাতে এযাবত্কালের সর্বোচ্চ ঘাটতি অর্থাত্ ৬ শতাংশ। এতদিন পাঁচ-সাড়ে পাঁচেই সীমিত ছিল। অস্বাভাবিক বছর, অস্বাভাবিক ঘাটতি হতেই পারে। এই ঘাটতি পূরণে ৮০ হাজার কোটি আসবে বিদেশি ঋণ হিসাবে। ব্যাংক দেবে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। বাকিটা দেবে জাতীয় সঞ্চয়পত্র। লক্ষণীয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এরই মধ্যে এডিপির আকারও বড়ো করে তা করা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। বাজেটের অর্থনৈতিক এই কাঠামোর সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা অনেক দিন থেকেই একটি। দুর্ভাগা এই দেশে পুরো উন্নয়নের টাকাই আসছে ঋণ থেকে—বিদেশি ও স্বদেশি ঋণ। সরকারের যা আয়, তা-ই খরচ। উন্নয়নের টাকা নেই। এটা বলছি কারণ আমাদের মোট ঘাটতি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, আর এডিপির আকার হচ্ছে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি। ঋণনির্ভর নয়তো কী?
কাঠামোগত দুর্বলতার প্রশ্ন বাদ দিলেও এবারের বাজেটে অগ্রাধিকার প্রশ্নে যা বলা হয়েছে বরাদ্দের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই। অর্থমন্ত্রী তার বাজেটে চারটি কৌশলের কথা বলেছেন : সরকারি ব্যয়ে কর্মসৃজনকে অগ্রাধিকার ও বিলাসী খরচ পরিহার, দ্বিতীয়ত—ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে কতিপয় সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি। এগুলো উত্তম কৌশল, অগ্রাধিকারও উত্তম। যেমন— স্বাস্থ্য ১ নম্বর, কৃষি ২ নম্বর, সামাজিক নিরাপত্তা ৩ নম্বর ও কর্মসৃজন ও পল্লি উন্নয়ন ৪ নম্বর। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তথ্য যখন মেলানো যায় তখন যে কোনো পাঠক গোলকধাঁধায় পড়বেন। অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় বলা হচ্ছে এক রকম, আবার যেসব তথ্য বাজেটের পরিশিষ্টে এবং বাজেটের সংক্ষিপ্তকারে দেওয়া হয়েছে তা অন্যরকম। এ রকম তথ্যে তুলনামূলক আলোচনা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মোট বাজেটের টাকার ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে ব্যয় হবে ৫.৬ শতাংশ টাকা। টাকার অঙ্কে তা মাত্র ৩১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গেল অর্থবছরে তা ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। বলা হয়েছে বিলাসী ব্যয় পরিহার করা হবে। কিন্তু বাজেটের কোথাও এই সম্পর্কে কোনো গাইডলাইন দেখলাম না। বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিতে চাইলে বাজেটের আকার আরো কম হতে পারে। শুধু এক টাকার কাজ এক টাকায় করতে হবে। সেটি হওয়ার নয়। বলা হয়েছে—স্বাস্থ্য ও কৃষিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের টাকা ১৩ কোটি মন্ত্রণালয় খরচ করবে। এতে হবে ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটের পরিশিষ্টে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনায় খরচ হবে ২২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। আমলারা কোন টাকা কোথায় কীভাবে, কোন হেডে দেখিয়েছেন—তা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল।
খাতওয়ারি অগ্রাধিকারভিত্তিক আলোচনা বাদ দিয়ে আমরা যেতে পারি বাস্তব জগতে অর্থাত্ করের ক্ষেত্রে। কর রাজস্বের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অবদান ২০১৩-১৪, ১৮-১৯, ১৯-২০ অর্থবছরের চেয়েও কম। তবে এখানে সাধারণ করদাতাদের লাভের দিক আছে। ‘মুজিববর্ষের’ উপহার হিসেবে অর্থমন্ত্রী পাঁচ বছর পর করমুক্ত আয়সীমা যেমন বাড়িয়েছেন, তেমনি পাশাপাশি কমিয়েছেন আয়করের হারও। সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বেড়েছে ৫০ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন কর হার ছিল ১০ শতাংশ। আগামী বছর হবে ৫ শতাংশ। অর্থমন্ত্রীকে সাধুবাদ এর জন্য। কারণ এতে মধ্যবিত্তের হাতে কিছু খরচের টাকা আসবে। বাজার চাঙ্গা হবে। কিন্তু পত্রিকায় শনিবার দেখলাম তাতে তো আবার বিপদ। একটি ব্যাংক কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন হ্রাস করেছে ১০ শতাংশ। পোশাক খাত বলছে কর্মী ছাঁটাই হবে। তা বাজার সৃষ্টি কীভাবে হবে। এরই মধ্যে আবার তিনি উচ্চতম করহার ৫ শতাংশ হ্রাস করেছেন। এটা করের সাম্যের নীতিতে পড়ে না। তিনি একটি বড়ো পদক্ষেপ নিয়েছেন। এতদিন ফ্ল্যাট/বিল্ডিং ক্রয়ক্ষেত্রে বর্গমিটারে নির্দিষ্ট হারে আয়কর দিলে কালো টাকা সাদা হতো। আয়কর বিভাগ প্রশ্ন করত না, কিন্তু দুদক করত। এবার দুদককে তিনি নিরস্ত্র করেছেন। আবার কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করেছেন। নগদ টাকা, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড, সিকিউরিটিজ, ব্যাংক আমানতের টাকা অপ্রদর্শিত থাকলে তা ১০ শতাংশ আয়কর দিয়ে করদাতা তার রিটার্নে ঘোষণা দিতে পারেন। কোনো প্রশ্ন কেউ করতে পারবে না, দুদকও নয়, আয়কর ও নয়। পদক্ষেপটি অভিনব। এর ফল কী হবে তা দেখতে হবে। বিশেষ করে, কালো টাকা আদায়করণের ক্ষেত্রে বিফলতার প্রেক্ষাপটে ‘ওভার ইন ভয়েসিং’, ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ করে বিদেশে টাকা পাচার বন্ধে তিনি পাচারকৃত টাকার ওপর ৫০ শতাংশ কর ধার্য করেছেন। বড়ো পদক্ষেপ। এই ক্ষেত্রে তিনি আরো শক্ত কথা বলেছেন। একটি কাগজের শনিবারের সংখ্যায় দেখলাম তিনি বলেছেন ‘টাকা পাচার বন্ধে প্রয়োজনে আইন সংস্কার করা হবে। তিনি আরো বলছেন, যারা দেশে টাকা খরচ করতে চায় না তারা বিদেশে চলে যাক। এর আগে অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন যাদের ছেলেমেয়ে বিদেশে তাদেরকে ব্যাংক ঋণ না নিতে। এসব থেকে মনে হয়, তিনি কঠোর হতে চান। পারবেন কী? পারলে সহজ পথ। বাংলাদেশের বিদেশে অবৈধ যত সম্পদ। টাকা বাড়িঘর আছে সব এক অর্ডারে জাতীয়করণ করুন। এটা দৃঢ় হলে সম্ভব। জাতিসংঘে দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন আছে। তাদেরকে যদি বলা হয় এসব সম্পদ উদ্ধার করে দাও। তারা তা করতে বাধ্য। তারা সব দেশের সঙ্গে পদক্ষেপ নেবে। এভাবে মার্কোসের টাকা, গাদ্দাফির টাকা দেশে দেশে আনা হয়েছে। ভারতীয়রা ব্যাংক ডাকাতদের ধরার জন্য বিদেশে মামলা-মোকাদ্দমা করছেন। অর্থমন্ত্রী এসব ভাবতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী রাজি হলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
বাস্তব ক্ষেত্র আরো আছে। বাজেটে দেখলাম, অর্থমন্ত্রী কৃষি ও শিল্পের সংরক্ষণের জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা ধন্যবাদের যোগ্য। পেরেক, স্ক্র ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি করে তিনি ক্ষুদ্রশিল্পের উপকার করেছেন। রপ্তানি শিল্পের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাংকিং সিস্টেম, কাটিং টেবিল আমদানি বিয়াতি সুবিধা দিয়েছেন। দেশীয় মধু ও লবণশিল্পের সংরক্ষণে শুল্ক কমিয়েছেন। পাদুকা শিল্প, ইলেকট্রনিকস, জাহাজশিল্প, কাগজ উত্পাদন এবং অন্যান্য শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি করে তিনি দেশীয় শিল্প সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। সেলুলার ফোন উত্পাদন, টেস্টিং কিট, পিপিই আমদানিতে সুবিধা দিয়েছেন। কিন্তু স্বর্ণের আমদানির ওপর ভ্যাট কমালেন কেন এটা বুঝলাম না। ভালো পদক্ষেপ লভ্যাংশের ক্ষেত্রে। ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশে কর বসবে না। দ্বৈত করও পরিহার করা হবে। আমানতকারীদের জন্য দুঃসংবাদ। তাদের আমানতে শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া হবে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কৃষিঋণ দেওয়া হবে ৫ হাজার কোটি টাকা। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার ফান্ড সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশীয় পেঁয়াজ রক্ষার্থে পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক বসেছে। কৃষি-যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হয়েছে। সার-বীজ কীটনাশকে শূন্য শুল্ক অব্যাহত থাকবে। ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করায় সাধারণ কৃষকরা লাভবান হবেন। পরিশেষে দুটো কথা বলতে চাই। বাজেটের গুণগত দিক উন্নত করার কোনো কথা নেই, কোনো বছরই থাকেও না। অনেক ‘রিফম’ করার কাজ লং ওভার ডিউ। এসব ব্যাপার কোনো কথা নেই। আর শেষ কথা ব্যাংক সম্পর্কে। মিডিয়া দেশবাসী ব্যাংকের ওপর নাখোশ। অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীরা রীতিমতো খ্যাপা। রাজনীতিবিদরাও। অথচ অর্থমন্ত্রীর কৌশল, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা। সরকারের লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রণোদনার কাজ ব্যাংকের মাধ্যমেই হবে। অগত্যায় গতি ব্যাংক। দুর্দিনে ব্যাংক। অথচ গাল খেতে হয় তাদেরকে। আগামী দিনেও খেতে হতে পারে। এটা মনে হয় একটি খবরে। ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার জন্য এক বড়ো কাস্টমারের মর্টগেজ দেওয়ার মতো সম্পত্তি নেই। অথচ কোলেটারেল ছাড়া ঋণ হবে না, তাই ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের এমডিকে গুলী করতে গিয়ে এখন দেশছাড়া বলে কাগজে দেখেছি। জরুরিভাবে ব্যাংকগুলোকে টাকা দিতে হবে। অথচ এসব প্রভাব শুরু হয়েছে। প্রলোভন হবে। সচেতন না থাকলে ঋণখেলাপ বাড়বে। আবার গাল খাবে ব্যাংকাররা। অতএব সাবধান।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
