মহাদুর্যোগময় সংকটকালীন এই করোনা পরিস্থিতিতে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে ধর্ষণ নামক ব্যাধি। বেড়েছে ধর্ষণের পর হত্যা আর নিষ্ঠুরতা। সামাজিক এই অপরাধের অভিঘাতে আমাদের সামাজিক কাঠামোতে এক শঙ্কিত পরিস্থিতি বিরাজমান। সাম্প্রতিক সময়ে শুধু যে মেয়েশিশু কিংবা নারীরাই ধর্ষিত হচ্ছেন তা নয়। বলাত্কারের শিকার হচ্ছেন ছেলেশিশুরাও। একশ্রেণির মানুষের যৌনবিকৃতি, অসুস্থ মানসিকতার দরুন আমাদের শিশুরা ধর্ষণের মারাত্মক ঝুঁকিতে। আসলে ধর্ষণ কী? ফৌজদারি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রচলিত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ৫টি উপাদানের সমন্বয়ে নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন মিলনকেই ধর্ষণ বলা হয়েছে। তবে এই সংজ্ঞায়ন বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকটাই অকার্যকর। ব্রিটিশদের ১৩০ বছর আগের পুরোনো প্রণীত আইনে ধর্ষণের বিচার এক ধরনের জটিল প্রক্রিয়া। যাহোক, প্রতিদিন গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত ধর্ষণের সংবাদটি যে কোনো মানবিক বিবেকবান মানুষই আঁতকে উঠবেন। লজ্জার শিহরণ জাগানো ধর্ষণের এই পরিসংখ্যান আমাদের নৈতিক ও সংস্কৃতির অধোগামিতার এক বাস্তব চিত্র।
চলতি ২০২০ সালের জানুয়ারি শুরু হয়েছিল নারীর ওপর আক্রমণ দিয়েই। করোনাকালের এই যাত্রায় ধর্ষণের মহামারির উপদ্রব কম হওয়ার ধারণা করা হলেও বরঞ্চ তুলনামূলক বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সংস্থাগুলোর ধর্ষণের দেওয়া তথ্যে রীতিমতো অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। এসব পরিসংখ্যান যে মানসিক অসুস্থতার যা জীবনের স্বাভাবিকতার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে সেটি বুঝতে গবেষণা কিংবা পরিসংখ্যানের দরকার হয় না। তবে এসবের পরেও ভাববার বিষয় হলো—মূলত পুরো পৃথিবীই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। সভ্যতার মেকি চাদরে আবৃত মানবাধিকারের সবক দেওয়া খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ধর্ষণ অপরাধে শীর্ষে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের চিত্রও ভয়াবহ। স্বয়ং দেশটির কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান মতে—১৩ মিনিটে একজন ধর্ষিত হয়। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব ক্রাইম ট্রেন্ড রিপোর্টে ধর্ষণে এগিয়ে থাকার যে তালিকা প্রকাশিত হয় সেই দিক থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটাই ভালো।
ধর্ষণ প্রবণতার এই মহামারির আসলে কিছু প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কারণও আছে। শতভাগ ধর্ষণবিহীন সমাজ বির্নিমাণ হয়তো সম্ভবপর নয়। ধর্ষণের ঘটনা শূন্যে না এলেও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। আমাদের সমাজে অপরাধের বিরোধিতার উপাদান মগজে মননে। এরপরেও কিছু বিষয়ের কারণে এই ব্যাধিটা সময়ে সময়ে ভয়াল রূপ নেয়। সাইকোপ্যাথিক মানসিকতার সঙ্গে আছে বিকৃত কুসংস্কারও। অন্তত ১৫০ বছর আগের ছাপা বটতলার বই নামে পরিচিত অশ্লীল সাহিত্যে উল্লেখ আছে—শিশু বা কুমারীদের সঙ্গে শারীরিক মিলন হলে যৌন রোগ নিরাময় হয়। অবশ্য এই কারণটাই ধর্ষণের মহামারির জন্য যথেষ্ট তা নয়।
ধর্ষণ নামের মারাত্মক এই মহামারি বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি পারিবারিকভাবে আমাদের সন্তানদের ওপর খেয়াল রাখতে হবে। ধর্ষণের প্রবেশ দ্বার নগ্নতা বেহায়াপনার নির্বিকার সেনসিটিভিটি থেকে সরে আসতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ক্ষমতার বাহাদুরির ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতি ও দ্বৈতব্যবস্থা বিলোপ করে সংবিধানের ২৭, ২৮ এর ২(৩), ২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সমাজে পুরুষালি আচরণের নামে যেন দানব না হয়ে ওঠে সেজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরুষ শাসিত মনোভাব ছেড়ে অ্যান্টিডট বা প্রতিষেধক হিসেবে ধর্ষণ রুখতে নিজেদের বিরুদ্ধেই দাঁড় হতে হবে। সর্বোপরি ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে একাট্টা হয়ে সবাইকে এই মহামারির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
