তৃণমূলে নব্য ছাত্রলীগ-যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগ নামধারীর কারণে সরকারের অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এসব নেতাকর্মীর কারণে সরকারের সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ, সরকারি নিয়োগসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাদের দাপট বিস্তৃত। চাঁদাবাজি, টেন্ডাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, জুয়া, জমি দখল, নারী নির্যাতন, আর নির্মাণ কাজ থেকে কমিশন দাবিসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে নব্যরা। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে সরকারি দলের একশ্রেণির নেতা এসব অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। তবে এটা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। অতীতে একসময় বিএনপি-জামায়াত করত, এখন রাতারাতি ভোল পালটে আওয়ামী লীগার হয়ে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, নব্যদের কারণে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এখন কোণঠাসা। প্রশাসনের কাছে তারা অপাংতেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরাও এসব নব্যদের প্রাধান্য দিচ্ছেন। কোনো কোনো এলাকায় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের উত্তরসূরিরা এখন তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা শাখার পদ-পদবি কিনেছেন তারা। হয়ে উঠেছেন বড়ো নেতাদের ঘনিষ্ঠ। একই সঙ্গে এসব পদবি ব্যবহার করে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ ব্যবসা, বাণিজ্য, ঠিকাদারিসহ সবকিছু নিজেদের আয়ত্বে নিয়েছেন। এসব বিরোধী মতাদর্শীরা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দুর্নীতি, চোরাচালান, জমি দখল, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখা প্রকল্পে লুটপাটসহ নানা কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। তাদের দাপটে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ও ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা। অবশ্য রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ বিরোধী একটি অংশ সবসময় সক্রিয় ছিল। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে এসব বিরোধীরা এখন আওয়ামী লীগে নাম লিখিয়ে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
টানা ১১ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সময়ে প্রায় ৫৫ হাজার বিরোধী মতাদর্শী আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে ঢুকে পড়েছে। সারাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোতে নির্দিষ্ট পদের জন্য নির্দিষ্ট টাকা নির্ধারণ করা আছে। আর এই সুযোগে অনুপ্রবেশকারী ৫৫ হাজার বিরোধী মতাদর্শী অনেকে টাকার বিনিময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদও পেয়েছেন। যাদের মধ্যে শুধু বিএনপি বা জাপা নয়, জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্যও রয়েছেন। অনুপ্রবেশকারীদের এই তালিকা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। সেখান থেকে অধিকতর অপকর্মে লিপ্ত ৫ হাজার নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয় গত নভেম্বর মাস থেকে। তাদের বহিষ্কার করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে চিঠিও দেওয়া হয় গত বছরের নভেম্বর মাসে। কিন্তু সাত মাস অতিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত কাউকে বহিষ্কার করেনি তৃণমূল আওয়ামী লীগ। অবশ্য চলতি বছরের মার্চ থেকে করোনা চলে আসায় সাংগঠনিক শাস্তি গ্রহণ প্রক্রিয়া এখন স্থগিত আছে।
আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল বহু সূত্র জানায়, অনুপ্রবেশকারীদের অনেকেই পদবি আর টাকার প্রভাব খাটিয়ে নির্বিঘ্নে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি নিয়োগ-বাণিজ্য, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ থেকে চাঁদা আদায়, মাদকের ব্যবসা, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালাচ্ছেন। তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে। বিতর্কিত এসব নেতার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন একশ্রেণির সংসদ সদস্য। এ কারণে স্থানীয় থানা ও প্রশাসন এ নব্যদের অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পায় না। কোনো কোনো কর্মকর্তা ব্যবস্থা নিতে গেলে ঐ কর্মকর্তাকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত কর্মকর্তা বলে বদলিসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। আবার স্থানীয় প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তাকেও কিনে নিয়েছেন এসব নেতা। সরকারের সমালোচনা ঠেকাতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ত্যাগী নেতাকর্মীরা।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশাল জয়ের পর থেকেই দলের বিভিন্ন স্তরে শুরু হয়েছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলভারী করার প্রবণতা। যার কারণে গত এক দশকে দলের ভেতর অনুপ্রবেশ ঘটেছে অনেকের। যাদেরকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘কাউয়া’ এবং ‘হাইব্রিড’ নামে অভিহিত করে আলোচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে বাস্তবতা এমন যে—ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী ও এ নব্য আওয়ামী লীগারদের দাপটে সারাদেশে মূলস্রোতের আওয়ামী লীগাররাই কোণঠাসা। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরই শুরু হয়েছিল সুবিধাভোগীদের অনুপ্রবেশ। দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর অনুপ্রবেশের মাত্রা বিস্ময়করভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সেই থেকে কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখে প্রায় লাগামহীনভাবেই সারাদেশে বাড়তে থাকে ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী লীগারদের সংখ্যা! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের অনুপ্রবেশ এখনো থেমে নেই। সরকারের ইমেজ বাড়াতে এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। আওয়ামী লীগের এক জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তিন জন সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে যারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের তালিকা তৈরি করিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের নভেম্বর থেকে সারাদেশে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। করোনা দুর্যোগ চলে গেলে বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ আবার শুরু হবে।
ইত্তেফাক/এএম
