ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় সহজীকরণ দরকার

আপডেট : ১৫ জুন ২০২০, ২১:৪৪

একজন হয়তো দক্ষ হাতে নিয়ম মানিয়া নিরাপদে গাড়ি চালাইলেন, কিন্তু অপরদিক হইতে কোনো অদক্ষ চালক যে তাহার ঘাড়ের উপর গাড়ি উঠাইয়া দিবেন না, তাহার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? বরং অদক্ষ চালকের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা না ঘটানোটাই অস্বাভাবিক। সুতরাং আমাদের দেশে সড়কে যে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল লাগিয়াই থাকে, তাহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। যদিও দুর্ঘটনা কেবল অদক্ষ চালকের জন্যই হয় না; গাড়ির ফিটনেস, রাস্তার বিভিন্ন ত্রুটিসহ বিবিধ কারণ থাকে। কিন্তু সকল অবকাঠামোগত ত্রুটি ঠিক করা হইলেও কেবল পর্যাপ্ত দক্ষ চালকের অভাবে দুর্ঘটনার লাগাম টানিয়া ধরা সম্ভব হইবে না। গত বত্সরের শেষের দিকে দুদকের তদন্তে দেখা গিয়াছে, কিছু না লিখিয়াও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা হইয়াছে পরীক্ষার্থীকে। দুদকের অভিযানকালে এনফোর্সমেন্ট টিম ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষা গ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম লক্ষ করিয়াছে। ইহার মধ্যে উন্মুক্ত পরীক্ষাকেন্দ্র, পরীক্ষার খাতায় প্রাপ্ত নম্বর উল্লেখ না করা, অতি অল্প সময়ে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা। সম্প্রতি একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুতে অনিয়মের শুরুটা হয় লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স দিয়া। ইহা অর্জন করিতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ। ইহার পাশাপাশি বিভিন্ন কাগজপত্রের সঙ্গে লাগে একজন ডাক্তারের সার্টিফিকেট। এই সকল কাগজপত্র যেন কাগুজে হইলেই হয়! এই জন্য ডাক্তার না দেখাইয়াও ‘জাল’ সার্টিফিকেট পাওয়া যায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্কেল অফিসগুলির আশপাশেই। শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নেওয়া চালকদের একটি বড়ো অংশই এই পথ অবলম্বন করে।

বিআরটিএর নিকট হইতে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স লইয়া দুই হইতে তিন মাস প্রশিক্ষণ লইবার নিয়ম প্রত্যেক চালকের। ইহা শেষ করিয়া তবেই তিনি বসিতে পারিবেন পরবর্তী পরীক্ষায়। অতঃপর ফিল্ড টেস্ট, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করিলে তবেই মিলিবে পেশাদার বা অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স। কিন্তু তদন্তে দেখা গিয়াছে, ইহার প্রতিটি পর্যায়েই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ফল্গুধারা বহিয়া যায়। ঘুষের জোরে কিংবা প্রভাবশালীর সুপারিশে প্রতিটি ধাপই পার হওয়া যায় অক্লেশে। তাহা ছাড়া বিআরটিএর অফিসগুলিতে দালালদের দৌরাত্ম্য কখনোই পুরোপুরি নিঃশেষ হয় নাই। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াও গাড়ির কাগজপত্র তৈরির ক্ষেত্রে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, হয়রানি ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিত্য ঘটনা। শুধু আইনের দুর্বল প্রয়োগ নহে, নিয়ম মানিয়া কেহ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র তৈরি করিতে গেলে সরকারনির্ধারিত ফির বাহিরেও তাহাকে দুই হইতে তিন গুণ টাকা খরচ করিতে হয়। অপরদিকে সকল নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করিয়া কেবল বড়ো মাপের ঘুষের মাধ্যমে সকল কার্য হাসিল করা যায় খুব সহজেই। এমনটি যে নূতন ঘটিতেছে তাহা নহে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই সকল সমস্যা লইয়া লেখালেখিও হইয়াছে অনেক। কিন্তু অবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন হয় নাই বলিলেই চলে।

প্রতিটি সমস্যাই বিভিন্ন সূত্রে বাঁধা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই সূত্রগুলি কঠোর হস্তে ছিন্ন করিতে হইবে। আবার ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ প্রক্রিয়ার সহজীকরণও দরকার। আমেরিকায় জোনিং ব্যবস্থার কারণে সেইখানে গাড়ির ব্যবহার কোনো বিলাসিতা নহে, বরং তাহা একান্ত প্রয়োজন। এই জন্য সেখানে গাড়ির লাইসেন্স পাইতে বেগ পাইতে হয় না। আমাদের দেশেও তাহা অনুরূপ সহজ করিবার চিন্তাভাবনা করা উচিত।