সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বদরউদ্দিন আহমদ কামরান গত রবিবার গভীর রাতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।
গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে হাজার হাজার ভক্ত, অনুরাগী ও সমর্থকদের চোখের জলে তাকে দাফন করা হয়। সিলেট নগরীর হযরত মানিকপীর (র) গোরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ‘জনতার কামরান’। কামরানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিন দিন সিলেট সিটি করপোরেশন কালো বেজ ধারণ এবং শোক পালন করবে।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
সোমবার বাদ জোহর তার নিজ বাসভবন এলাকা ছড়ারপার জামে মসজিদে প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অল্পসংখ্যক লোক জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করেন। কামরান এই মসজিদের মোতাওয়াল্লি ছিলেন।
কামরান পুত্র ডা. শিপলু জানান, রবিবার রাত ১১টায় বাবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং ২টা ৩০ মিনিটের দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ৫ জুন বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের করোনা শনাক্ত হয়। এরপর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ঢাকায় এনে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। সেখানে ‘প্লাজমা থেরাপি’ দেওয়ার পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও রবিবার গভীর রাতে তার প্রিয় সিলেটবাসী, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও পরিবারের সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান।
মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন কামরান। সিলেটের ঘরে ঘরে যার পরিচিতি। তার অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে প্রান্তিক জেলা সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট হতে বৃহত্তর সিলেটের প্রবেশদ্বার মাধবপুর পর্যন্ত তার পরিচয় বিস্তৃতি লাভ করে ‘জনতার কামরান’ হিসেবে। শুধু তাই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ও নিজ দলের শীর্ষ পর্যায় ছাড়াও দেশের রাজনৈতিক মহলে কামরান ছিলেন অতিপরিচিত ব্যক্তিত্ব। আপাদমস্তক ভালোবাসায় ভরপুর বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের সাহচার্যে এসে কেউ দুঃখ পেয়েছেন এমন লোক পাওয়া মুশকিল হবে। তিনি ছিলেন উদার গণতন্ত্রমনা।
ছাড়ারপার বাসায় হূদ্য়বিদারক দৃশ্য
জননেতা কামরানের মৃত্যু সংবাদ সোমবার ভোরে ছড়িয়ে পড়লে নগরীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সকালে আলো ফুটতে না ফুটতেই কামরানের বাসভবন ছড়ারপারে ভিড় বাড়তে থাকে। সময় যতই গড়াচ্ছিল মানুষের লাইন দীর্ঘ হচ্ছিল। এক পর্যায়ে বর্তমান সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও ছুটে আসেন। উপস্থিত কারো মুখে কোনো কথা ছিল না।
সিএমএইচ থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে দুপুরে লাশ এসে বাসায় পৌঁছলে কান্নার রোল পড়ে। হূদ্য়বিদারক এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এর আগে সিটি করপোরেশনের সীমানা চনডি পুলে গিয়ে মরদেহ গ্রহণ করেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। আরিফুল হক কামরানের লাশ কিছু সময়ের জন্য নগর ভবনে নিতে চাইলেও করোনা পরিস্থিতির জন্য তা আর সম্ভব হয়নি।
১৯৭২-২০২০ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
১৯৬৯-এর উত্তাল সময়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি কামরানের। ১৯৭২ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় সিলেট পৌরসভার সর্বকনিষ্ঠ কমিশনার হয়ে চমক দেখান তিনি। সেই থেকেই সিলেট পৌরসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েন। টানা ১৫ বছর ছিলেন পৌরসভার কমিশনার। এরপর প্রবাস থেকে ফিরে এসে ১৯৯৫ সালে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন হলে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পান কামরান। ২০০৩ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তিনি। ওয়ান ইলেভেনের সময় দুবার কারাবরণ করেন। ২০০৮ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় নির্বাচনে লড়ে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন। তবে সর্বশেষ দুটি সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যান তিনি।
রাষ্ট্রপতির শোক
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে সিলেটের উন্নয়নে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান যে অবদান রেখেছেন সেজন্য মানুষ তাকে সবসময় মনে রাখবে। তার মৃত্যুতে দেশ একজন নিবেদিত প্রাণ নেতাকে হারাল।’
প্রধানমন্ত্রীর শোক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক শোক বিবৃতিতে বলেন, ‘স্বীয় কর্মের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতা কামরান গণমানুষের হূদয়ে বেঁচে থাকবেন।’ প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
জাতীয় পার্টি-জেপির শোক
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। এক বিবৃতিতে জেপির নেতৃদ্বয় বলেন, তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় ও জননন্দিত রাজনীতিবিদ এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সিলেটে অনেক উন্নয়ন তত্পরতায় জড়িত ছিলেন। আমরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।
আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর শোক
বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সদস্য, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক (মন্ত্রী) আলহাজ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি।
নূর-ই-আলম চৌধুরীর শোক
বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সেক্রেটারি নূর-ই-আলম চৌধুরী এমপি।
ব্রিটিশ হাই কমিশনারের শোক
বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, তার মৃত্যুতে খুবই মর্মাহত হয়েছি। তিনি একজন ভালো বন্ধু যিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মানুষে মানুষে যোগাযোগ ও গভীর বন্ধন গড়তে সব সময় ভূমিকা রেখেছেন।
