তালপাতার চশমা

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ০২:০৭

মিতুল, রিতুল, অপু, লিটু ও বিল্টুরা একসাথেই খেলাধুলা করে। নানান রকমের খেলা।
কানামাছি। গোল্লাছুট। ওপেন টু বায়োস্কোপ। ইচিং বিচিং। আরো কত কী।

পুঁচকেদের দলনেতা হলো অপু। কবে কী খেলা খেলবে, অপু সবাইকে আগেই জানিয়ে
দেয়। সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে আসে ওরা।

একদিন ওরা খেলল ইচিং বিচিং। খেলা শেষে বাড়ি ফেরার সময় অপু সবাইকে জানিয়ে
দিল, কাল বিকেলে হবে সেলফি সেলফি খেলা। অপু আরো বলল, আসলে এটা কোনো
খেলা নয়। ছোট চাচুর নতুন কেনা মোবাইলটা মাত্র দু ঘণ্টা ব্যবহারের জন্য অনুমতি
পেয়েছি। শুধু সেলফি তোলার জন্য। তাই কাল আমরা সবাই মিলে সারা বিকেল সেলফি
তুলব। ফুলের সাথে। পাতার সাথে। এমন কি ফড়িংয়ের সাথেও। খুব মজা হবে, তা-ই
না?

সবাই চেঁচিয়ে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব মজা হবে।

অপু বলল, আরো একটি কথা শুনে রাখো।
সবাই একসাথে প্রশ্ন করল, কী কথা? কী কথা?

অপু বলল, কথাটা হলো, সবাইকে কিন্তু চশমা পরে আসতে হবে। যে চশমা পরে না
আসবে, তাকে খেলায় নেব না। মনে থাকে যেন।

সেলফি সেলফি খেলাটার কথা শুনে সবার মন আনন্দে নেচে উঠল। কিন্তু অপু যখন
চশমার কথাটা বলল, তখন থেকেই লিটুর মন ভালো নেই। কারণ, মিতুল রিতুল অপু ও
বিল্টুদের চমশা আছে। কিন্তু লিটুর চশমা নেই।

লিটু বাবাকেও বলতে পারবে না, আমাকে একটা চশমা কিনে দাও। ওর বাবাটা তো
আকাশের তারা হয়ে গেছে। শুধু মা আছে ওর। ও মনে মনে ভাবল, কাল বিকেল হওয়ার
আগেই মাকে চশমা কিনে দিতে বলব।

কিন্তু ভুলোমনা লিটু বাড়ি গিয়ে কথাটা মাকে বলতে ভুলে গেল। রাতেও মনে পড়ল না।
খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর রাত পোহাল। সকালে ইশকুলে গিয়ে ক্লাস শেষ করে
ফিরে এল। তবুও মনে হলো না। ওর যে চশমা কিনতে হবে—সেকথা মনে পড়ল

বিকেলবেলা। খেলতে বেরোবার কিছুক্ষণ আগে। তখনই মাকে বলল কথাটা। মা,
আমাকে একটা চশমা কিনে দিতে হবে। আজ, এক্ষুনি। আজ আমরা সেলফি সেলফি
খেলব। চশমা না থাকলে ওরা আমাকে খেলায় নেবে না।

মা বললেন, ঠিক আছে বাবা, তোমাকে খুব সুন্দর একটা চশমা কিনে দেবো। কিন্তু এখন
তো দেওয়া যাবে না।

লিটু বলল, কেন মা, দেওয়া যাবে না কেন? দিতেই হবে। দিতেই হবে। এক্ষুনি দিতে হবে।
চশমা না হলে আমি সেলফি সেলফি খেলব কেমন করে?

মা বললেন, তুমি তো অনেক বড়ো হয়েছ সোনামানিক। তুমি তো অনেক কিছু বোঝো।
এখন কীভাবে কিনে দেবো? আমাদের গ্রাম থেকে চশমার দোকানগুলো অ-নে-ক দূরে।
যেতে-আসতেই রাত হয়ে যাবে।

মায়ের কথা শুনে লিটু কেঁদে কেঁদে বলল, তুমি আমাকে চশমা কিনে দিচ্ছ না। বাবা যদি
আকাশের তারা না হতো, তাহলে আমাকে এক্ষুনি চমশা কিনে দিত।

লিটুর কান্নায় মায়ের চোখও জলে ভিজে গেল। আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছলেন তিনি।
লিটুর চোখমুখও মুছে দিলেন। তারপর লিটুকে বুকে জড়িয়ে বললেন, তুমি আর একটুও
কাঁদবে না সোনা। তোমাকে একটা রঙিন চশমা তো কিনে দেবোই। কিন্তু এক্ষুনি বানিয়ে
দিচ্ছি দারুণ একটা চশমা!

সঙ্গে সঙ্গে লিটুর চোখমুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। বলল, সেটা আবার কেমন চশমা,
আমাকে বলো না মা?

মা বললেন, সেটা হচ্ছে তালপাতার চশমা। পরলে খুব সুন্দর দেখায়। আমি যখন ছোট্ট
ছিলাম, তখন আমার মা আমাকে মাঝেমাঝেই তালপাতার চশমা আর হাতঘড়ি বানিয়ে
দিতেন।

লিটু বলল, চশমা তো দেবেই। ঘড়িটাও বানিয়ে দিয়ো মা।

মা বললেন, তোমার তো হাতঘড়ি আছেই। আজকে শুধু চশমাটা বানিয়ে দিচ্ছি। ওদিকে
আবার খেলার সময় হয়ে যাচ্ছে।

উঠোনের পাশেই ছিল তালগাছ। সেই তালগাছের পাতা কেটে আনলেন মা। তারপর
নিপুণ হাতে খুব সুন্দর করে একটা চশমা বানালেন। লিটু চশমাটা চোখে পরে হাসতে
হাসতে মাঠের দিকে ছুটল।

ছোটো চাচুর মোবাইল নিয়ে রঙিন চশমা পরে হাজির হলো অপু। বিল্টু রিতুল
মিতুলরাও এল রঙিন রঙিন চশমা পরে। শুধু লিটু এল তালপাতার সবুজ ফ্রেমের চশমা
চোখে লাগিয়ে।

লিটুর চোখে তালপাতার চশমা দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। বলল, তোমাকে
দারুণ লাগছে লিটু! কে বানিয়ে দিল অমন সুন্দর চশমা?

ওদের বাহবা পেয়ে লিটুর মনটা আনন্দে ভরে গেল। হেসে হেসে বলল, মা বানিয়ে
দিয়েছেন।

তারপর শুরু হয়ে গেল সেলফি সেলফি খেলা। ইচ্ছেমতো সেলফি তুলল সবাই।
তালপাতার চশমা পরে তোলা লিটুর সেলফিটাই হয়ে উঠল অন্যরকম সুন্দর। সেরা এক
সেলফি।