ভালোমন্দের বাজেট ২০২০-২১

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ২১:২১

আপাতদৃষ্টিতে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটটি বেশ বড়ো। ২০১৯-২০ সালের তুলনায় এটি ৮.৮৭ শতাংশ বেশি হলেও মোট সামষ্টিক আয় জিডিপির ১৭.৯ শতাংশ অর্থাত্ এখনো প্রমিত সাইজ সামষ্টিক আয়ের এক-পঞ্চমাংশে (২০ শতাংশ) উন্নীত হয়নি। এবারের বাজেটে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক আছে। তবে এর বিশাল কয়েকটি নেতিবাচকতা করোনার মারাত্মক বিপর্যস্ততার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে একধরনের নিরাশারও সৃষ্টি করেছে।

কৃষি খাত ও খাদ্যনিরাপত্তা : বলতে দ্বিধা নেই, আলোচিত বাজেটে কৃষি খাতের ভর্তুকি সমুন্নত রেখে (৯৫০০ কোটি) কৃষি উপকরণ কিষান-কিষানির ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক কর্মীসহ যেভাবে কৃষিশ্রমিক জোগাড় করে বোরো ধান কাটা হয়েছে (লালমনিরহাট থেকে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় ধান কাটার শ্রমিক এসেছেন) তার জন্য সদাশয় সরকার বিশেষ করে কৃষিমন্ত্রী মহোদয়কে অশেষ ধন্যবাদ। এখন যা দেখার বিষয় তা হচ্ছে, মধ্যস্বত্বভোগী তথা কিছু দুর্নীতিবাদ কর্মকর্তা এবং মিলমালিকদের কারসাজিতে হাসিনা সরকার সময়োচিতভাবে ঘোষিত ১ হাজার ৬০ টাকা মণ দরে ধান সংগ্রহ বিষয়ে যে এন্তার নালিশ রয়েছে, তা দূর করে প্রয়োজনবোধে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা নিয়ে ৮ লাখ টন ধান সংগ্রহ করে আগামী এক বছরের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

সমবায় : প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথে কৃষি উত্পাদন ও বিপণন সমবায় গড়ে তুলে, সমিতিকে অত্যন্ত সুলভ সুদে ঋণ দিয়ে এবং গুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে বছরব্যাপী চালের মূল্য স্থিতিশীল  রাখা যায়। এতে উত্পাদনকারী দাম ভালো পাবে আর ক্রেতারা ভোগ করবে কম দামে—এটি হতে পারে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের একটি শ্রেষ্ঠ নৈবেদ্য।

স্বাস্থ্য খাত : ২০২০-২১ সালের বাজেটের একটি মোক্ষম দিক হচ্ছে করোনায় দিশেহারা সমন্বয়হীন, দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ, সেকেলে এবং কম ভাগ্যবানদের প্রতি অবহেলাপ্রবণ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ২০১৯-২০ সালের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি করে ২২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা। তাছাড়া করোনার কারণে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। রাখা হয়েছে চিকিত্সক, নার্স, স্বাস্থ্যসেবার কর্মীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা। সবচেয়ে সুখবর হলো—১০০ কোটি টাকার একটি গবেষণা বরাদ্দ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় : দুর্নীতির দুর্ভেদ্য প্রাচীর (বলা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটা মানেই দুর্নীতি, যেমন—ফেসমাস্ক কেনাতে পুকুরচুরি) ভেদ করে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাইরে গিয়ে সময়মতো উচিতমূল্যে আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ সব যন্ত্রপাতি ওষুধপত্র কেনা এবং ন্যায্যভাবে বিতরণ ব্যবহার করা যাবে কি না। এ বিষয়ে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ বাজেটে নেই কেন? একটি দক্ষ ও স্বচ্ছ ড্রাগ প্রশাসন বিভাগ স্থাপন করা গেলে বিত্তবানদের ঘরে অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত হতো না, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দামে লাগামহীনতা বিরাজ করত না। দেশে-বিদেশে নন্দিত ১৮ বছরের প্রধানমন্ত্রী জনবন্ধু শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—আপনার কল্যাণরাষ্ট্রে ওপরের সংস্কার একেবারেই আশু কর্তব্য ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সিএমএসএমই (CMSME) : কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মধ্যম পরিধি বা সাইজের শিল্প উদ্যোগ (CMSME) মাধ্যমে কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পুনর্জাগরণ প্রচেষ্টা আলোচিত বাজেটের একটি অন্যতম ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য। ২০ হাজার কোটি টাকার রেয়াতি সুদের (৪.৫ শতাংশ) প্রণোদনা প্যাকেজ এবং প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এসএসই বর্ষে প্রধানত স্থানীয় উপাদাননির্ভর, স্বল্প জেস্টেশন পিরিয়ড, বিপুলভাবে কর্মসংস্থান মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিরসনকারী অর্থনীতির এই মেরুদণ্ডকে লালন করা খুবই জরুরি।  যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো এই উপখাতটিতে বাংলাদেশেও কর্মসংস্থানের ৬০-৬৫ শতাংশ অর্জন করে প্রকৃত অর্থনীতিকে (রিয়াল ইকোনমি) সমৃদ্ধ করা সম্ভব এবং জরুরি। বাজেটে এ সম্পর্কে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট উচ্চবাচ্য নেই। একটি ফোক্যাল পয়েন্ট এখন সময়ের দাবি।

সামাজিক নিরাপত্তা বলয় : ২০২০-২১ সালের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বরাদ্দ ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৯৫ ১৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা (বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.০১ শতাংশ) করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে অসাধারণ দূরদৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনকল্যাণে নিবেদিত এ ধারাটি শুরু করেছিলেন। এখান থেকে পেনশনের টাকা দেওয়ার পর বাকিদের জন্য যা থাকে তা থেকে বিদ্যমান উপকারভোগী ছাড়াও আরএমজি থেকে চাকরিচ্যুতি, প্রবাসফেরত এবং করোনার কশাঘাতে নিক্ষিপ্তদের জন্য অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ বিবেচনা করা যেতে পারে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল এবং অন্যান্য ত্রাণে সহায়তাতে কতিপয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও জনদ্রোহী যেভাবে ভাগ বসাচ্ছে তাতে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ চাল উত্পাদনকারী এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ মিঠাপানির মাছ উত্পাদনকারী দেশ লজ্জা পেতেই পারে। অথচ বিশাল অর্জনে ১০ বছর আগেই হাসিনা সরকার ‘মঙ্গা’ শব্দের ধারণাকেই এদেশ থেকে উঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

দেশীয় শিল্পে সুরক্ষা : আমদানিকৃত উপাদানে শুল্ক হ্রাস করে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠায় উত্সাহ দানের ইতিবাচক ধারাটির প্রশংসা করতেই হবে। সম্প্রতি দুটো শক্তিশালী প্রতিবাদ থেকে জানা যায় যে দেশে বিপুল পরিমাণ তরল দুধের সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও গুঁড়ো দুধ প্যাকেটজাতকরণের বৈদেশিক দুধমণ্ডের ওপর শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এটি চালাকি, নাকি অজ্ঞতা তা জানি না—তবে এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আমদানি শুল্ক ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে যেভাবে বাড়ানো হয়েছিল, সেভাবেই বৃদ্ধি করে দেশি গুঁড়ো দুধ বানানোর উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাদের বিপুলভাবে লালন করে স্বকল্প সংস্থান সৃষ্টি পথ প্রশস্ত করা যায়। অনুরূপভাবে ইস্পাতের আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো জরুরি। রীতিমতো ফলিত গবেষণায় দেশীয়ভাবে শিল্প উত্পাদনের ক্ষেত্র নিশ্চিত ও সমর্থন করে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ তথা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান বছরের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করেছে যে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কতখানি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্রণোদনা ও সব ধরনের সুবিধা সর্বোচ্চ হলেও কর্মী ছাঁটাই চলছে; কারণ বিদেশি ক্রেতাগণ নাকি ক্রয়াদেশ বাতিল করছে। বন্ড জালিয়াতির কোনো বিচার-আচার হচ্ছে না কেন? শুধু কিছু বিত্তবানের সুলভ মূল্য আমদানির স্বার্থে অতি মূল্যায়িত টাকায় রেমিট্যান্স ও পোশাক রপ্তানিতে ‘প্রণোদান’ তথা মাল্টিপল এক্সচেঞ্জ রেটের সমূহ বিপদ থেকে সরে আসাটা যত শিগিগরই করা যাবে ততই মঙ্গল।

অর্থায়নের গোঁজামিল : ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থায়নে জোড়াতালি অত্যন্ত স্পষ্ট। ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বর্তমান পর্যায়িক ৪.৪ ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিট্যাল আউটপুট রেশিও (আইকর) বলে দিচ্ছে যে জিডিপির ৩৬ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে। বাজেটে বলা হয়েছে, বর্তমান বছরের  ১৩ শতাংশ থেকে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ২৫ শতাংশে উন্নীত হবে—করোনায় লন্ডভন্ড এবং মূলত ব্যাংকের আকর্ষণীয় লভ্যাংশ নিয়ে সন্তুষ্ট শক্তিশালী কার্টেলভুক্ত ব্যক্তি খাতের ব্যাংক মালিকেরা এ ধরনের বিনিয়োগ উল্লম্ফন দেবেন, তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। আবার মূলধন মার্কেট বিমা প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল থেকেও আসছে না। অদ্ভুত বিধান বিএসইসিতে : একটি কোম্পানিতে যার ২ শতাংশ ইকুইটি নেই, তিনি সেখানে পরিচালক হতে পারবেন না!

কালোটাকা সাদাকরণ : বিভিন্ন শাসনামলে ১৬ বার ব্যর্থ প্রয়াসের পরও এবার আবার কালোটাকা সাদা করার অনৈতিক ব্যবস্থা বাজেটে রাখা হয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকার মালিকরা তাদের প্রশ্নবিদ্ধ উপায়ে কবজা করা অবৈধ অর্থ সাদা করে ফেলতে পারবেন বিনা প্রশ্নে এবং তা মূলত আবাসন খাত ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সাপেক্ষে। অনৈতিক হলেও শেষবারের মতো কঠিন শর্তাবলির মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয় (যা সরকারের নীতির কারণেও সৃষ্টি হয়) এবং অবৈধ কালোটাকা আয়করণের স্তরে নির্দিষ্ট করা আয়কর দিয়ে অর্থনীতির মূল ধারায় এনে যে কোনো খাতে বিনিয়োগ করা যাবে এই শর্ত সমূহে যে—

ক. এ সম্পর্কে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না, খ. ০১.০৭.২০২১ তারিখে কারো কাছে কোনো কালোটাকা থাকলে তা সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারবে এবং এ সম্পর্কে কোনো আপত্তি আদালতে গ্রাহ্য হবে না, গ. ব্যাংকিং সিস্টেম, শুল্ক প্রশাসন, বেসামরিক বিমান চলাচল, স্থল ও নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং গোয়েন্দ সংস্থাসমূহের সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগে কালোটাকা দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ার সব পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হবে এবং ঘ. ২০১৯-২০ বাজেটকালে ঘোষিত স্ক্যানিং মেশিন বসিয়ে আমদানির ওভারইনভয়েজিং এবং রপ্তানির আন্ডার ইনভয়েজিংয়ের সব রাস্তা রুদ্ধ করা হবে (সূত্র :২০১৯-২০ বাজেট বক্তৃতার পৃষ্ঠা ১৪ প্যারা ৪৮)।

একটি দর্শন ও কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার সন্ধানে : বিশ্বে অর্থনীতির কক্ষপথে বিশাল উত্থানপতন এমনিতেই শুরু হয়েছিল। গণচীনের উহানে প্রথম জানা করোনা ভাইরাস যে তাণ্ডবে বিশ্বকে ছারখার করে দিচ্ছে, তাতে চীন অর্থনীতির বৃহত্তম পরাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থনীতির অক্ষশক্তি প্রতিযোগিতার খুবই উদ্ভ্রান্ত হয়ে চীন মিত্র খুঁজছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান এমনকি রাশিয়াও চীনের সঙ্গে নেই। বিগত ১১ বছরে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থার সুযোগ এবং জনবন্ধু শেখ হাসিনার অসামান্য কূটনীতি কৌশলে বাংলাদেশ খুবই ভালো অবস্থানে। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুসহ আমরা কীভাবে চীনের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারি, তার ‘হোমওয়ার্ক’ হচ্ছে কি! করোনার ভ্যাকসিন মাস দুই-তিনের মধ্যেই বাজারে আসবে বলে অনুমান। বাংলাদেশ কি বেশি বেশি পরিমাণে এই ভ্যাকসিন কেনার যোগাযোগ ও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে!

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত এবং তারই সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ সন্তান নেতৃত্বের বিচক্ষণতার শীর্ষে থাকা শেখ হাসিনার অর্জিত আর্থসামাজিক উন্নয়নের মহাসড়কে আমাদের পুনরুত্থান ঘটাতেই হবে। ‘চাটার দল’ সাবধান, হুঁশিয়ার।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও সমাজকর্মী