প্রকৃতির প্রতিশোধ মহামারি ও মহাদুর্যোগ

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ২১:২২

মহামারি, মহাদুর্যোগ কখনো বলেকয়ে আসে না, আচমকাই আঘাত হানে। এটাই হচ্ছে প্রকৃতির রহস্য। তবে বিজ্ঞানের কল্যাণে কিছু কিছু দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও মহামারির ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি আজ অবধি। অথবা সে ধরনের কোনো প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি পূর্বাভাস দেওয়ার মতো। আবহাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও ভূমিকম্প-সুনামি কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুতপাত সম্পর্কে ততোধিক নিশ্চিত হয়ে বলা যায়নি। মহামারির ক্ষেত্রে অনুমান করা যায় যে পাশের দেশ অথবা পাশের গ্রামের মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে, এখন নিজ দেশ অথবা নিজ গ্রামেও সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মহামারি সংক্রমিত হবে এতদিনের মধ্যেই, সে ধরনের কোনো তথ্য প্রদান করার ক্ষমতা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অথচ মানুষ চন্দ্র বিজয় করেছে, মহাশূন্যে টম্যাটো চাষ করে খাচ্ছে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে বেড়ানোর পাঁয়তারা করছে, সমুদ্রের তলদেশ থেকে নুরিপাথর কুড়িয়ে আনছে। আরো কত কী যে মানুষ করেছে তার হিসাব বোধ করি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাতে মহামারির প্রসঙ্গ ব্যাহত হতে পারে।

আমরা মহামারির কথা বলছি। বলছি একটি ক্ষুদ্র জীবাণুর কথা, একটি ভাইরাসের কথা। যাকে পিষে ফেলতে হলে (যদি চোখে দেখা যেত) প্রয়োজন হতো না এক দিন বয়সের একটি শিশুর শক্তিও। অথচ শক্তিতে এতটাই দুর্বল একটি জীবাণু মানুষকে মুহূর্তেই ঘায়েল করে ছাড়ছে। বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিতের মধ্যে রাখছে। রাজা-উজির থেকে শুরু করে ভিখারিকে পর্যন্ত অ্যাটাক করে কিংবা প্রাণের বিনাশ ঘটাচ্ছে। তেমনি একটি ভাইরাসের শক্তির কাছে বিশ্ববাসী আজ পরাজিত হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব মহামারি ২০১৯ সালেই প্রথম নয়; শত শত বছর আগেও বিশ্বে দফায় দফায় মহামারি হানা দিয়েছিল। কেড়ে নিয়েছে কোটি কোটি প্রাণ। কত সভ্যতাকে যে ধ্বংস করে দিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। চলমান বিশ্ব মহামারির আগে সর্বশেষ আমাদের দেশে হানা দিয়েছিল গুটিবসন্ত ও কলেরা। সেসব থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে। ততদিনে দেশে অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল। আবার দেখা গেছে, গুটিবসন্ত আক্রান্তের পরেও বেঁচে থাকা কিছু মানুষের মুখে বড়ো বড়ো গর্ত বা দাগ রয়ে গেছে। আবার অনেক মানুষ অন্ধত্ব বরণ করেও দিনাতিপাত করছে। সেই ভয়ংকর ভাইরাসেরও বিনাশ ঘটেছে। মানুষের আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের কাছেই পরাজিত হয়েছে গুটিবসন্ত ও কলেরা। তদ্রূপ করোনা ভাইরাসও একদিন পরাজিত হবে মানব জাতির কাছেই।

শুরুতেই আমরা বলেছি যে বিশ্ব মহামারি বলেকয়ে আসে না, এটি প্রকৃতি প্রদত্ত। শুধু তাই নয়, আমরা বলব, এটি প্রকৃতির প্রতিশোধও। আমরা নানান কারণে প্রকৃতির ওপর জোরজলুম অব্যাহত রেখেছি। অপ্রয়োজনে প্রকৃতিকে খুন করছি, প্রকৃতিকে জব্দ করতে গিয়ে আজ নিজেরাই জব্দ হয়ে পড়েছি তাই। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, একটি জীবাণু বা ভাইরাস এমনি এমনি উত্পত্তি হয়নি কিংবা মানুষের মধ্যে নিজ থেকেই ছড়িয়ে পড়েনি। এর জন্য অবশ্যই দায়ী মানব জাতি। দুইভাবে দায়ী মানব জাতি। যেমন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কথা ধরা যাক আগে। আমরা জানি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্য নায়ক ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো। বড়ো বড়ো শিল্পকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, নির্বিচারে বন উজাড়, নদী শাসন ইত্যাদির ফলে দারুণভাবে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর খামখেয়ালিপনার কারণে সিএফসি গ্যাস, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের নির্গমন বেড়ে গেছে।

নতুন জীবাণুর উত্পত্তি হলেও আমাদের মধ্যে কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়ছে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে অনেকের মাঝেই। ব্যাপারটি খুব সোজা। এসব জীবাণু প্রথমে সংক্রমিত হয় বন্য প্রাণীর শরীরে। সেখান থেকে খুব সহজে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। এটি হচ্ছে অবাধে বন্য প্রাণী নিধনের কারণে। তার প্রমাণও আমরা বার কয়েক পেয়েছি। বার্ডফ্লু, ইবোলা ভাইরাস, নিপা ভাইরাসসহ আরো অনেক ভাইরাস দ্বারা মানুষ সংক্রমিত হয়েছে বন্য প্রাণীর মাধ্যমে। বলে রাখা ভালো, এসব বন্য প্রাণী দৌড়ে এসে আমাদের গায়ে ভাইরাস ছিটিয়ে যায়নি, বরং আমরাই ওদের কাছে গিয়েছি। বিভিন্নভাবে বিরক্ত করছি অথবা বন্য প্রাণী নিধন করে খাবারের তালিকায় নিয়ে এসেছি। ফলে ভাইরাস অতিসহজে সংক্রমিত হতে পেরেছে আমাদের শরীরে। সর্বশেষ করোনা সম্পর্কেও এমনটি ধারণা করছেন অনেকেই। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে কি আমরা বলতে পারি না যে এটি হচ্ছে অবাধে বন্য প্রাণী নিধনের ফল? যে ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃতি আমাদের ওপর রুষ্ট! যার শিকারে এখন নিজেরাই পরিণত হয়েছি!

n লেখক :বন্যপ্রাণী বিশারদ