কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সন্ধান পাওয়া গেছে! যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী এই কার্যকরী ওষুধের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছেন। গবেষকরা বলছেন, স্বল্পমাত্রার স্টেরয়েড চিকিত্সায় ব্যবহূত ‘ডেক্সামেথাসন’ হচ্ছে সেই ওষুধ। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডেক্সামেথাসনকে বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ওষুধ ব্যবহার করলে ভেন্টিলেটর থাকা রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি এক-তৃতীয়াংশ কমানো যাবে। আর যাদের অক্সিজেন দিয়ে চিকিত্সা করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তবে যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন নয়, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধের তেমন কার্যকারিতা নেই। খবর বিবিসি
এদিকে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, এই ওষুধটি বাংলাদেশের অনেক কোম্পানি তৈরি করে বাজারজাত করে আসছে। এর ব্যবহারে বেশ কয়েক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। তবে এটি ব্যবহারে খুবই সর্তক হতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দামে সস্তা এবং সারা বিশ্বেই এই ওষুধ পাওয়া যায়। বিশ্বে করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন ওষুধ পরীক্ষামূলক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। এরমধ্যে সর্ববৃহত্ যে পরীক্ষা চালানো হচ্ছিল তার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছিল এই ওষুধ করোনা ভাইরাসের চিকিত্সায়ও কাজ করবে কি না। গবেষকরা বলেন, ব্রিটেনে যখন প্রথম করোনা ভাইরাসে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, তখনই যদি এই ওষুধ ব্যবহার করা হতো, তাহলে অন্তত ৫ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করা যেত। দামে সস্তা হওয়ার কারণে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সায় এই ওষুধ ব্যাপক হারে কাজে লাগাতে পারবে। মারাত্মকভাবে অসুস্থ রোগীদের জীবন বাঁচাতে খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে এই ডেক্সামেথাসন। রোগী সামলাতে হিমশিম খাওয়া প্রতিটা দেশের জন্যই এটি দারুণ সুখবর।
সাধারণত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই হাসপাতালে ভর্তি ছাড়াই সুস্থ হয়ে যায়। এছাড়া যারা হাসপাতালে ভর্তি হয় সেখান থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। কিন্তু কিছু রোগীর জন্য ভেন্টিলেশন সাপোর্ট এবং অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। এই ধরনের রোগীদের জন্য সব সময় ভেন্টিলেটর কিংবা অক্সিজেন পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধরনের উচ্চঝুঁকির রোগীদের জন্য ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে ডেক্সামেথাসন।
শরীরের প্রদাহ কমানোর জন্য সাধারণত এই ডেক্সমেথাসন ব্যবহূত হয়। আর আক্রান্ত রোগীর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা যখন করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে তখন শরীরে প্রদাহ মারাত্মকভাবে বেড়ে যেতে পারে। হঠাত্ করে শরীরের এই অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতি। এই সমস্যা থেকে অনেকটাই রক্ষা করে প্রাণ বাঁচাতে পারে ডেক্সামেথাসন।
ডেক্সামেথাসনের ট্রায়ালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা হাসপাতালে ভর্তি দুই হাজার করোনা আক্রান্ত রোগীদের এই ওষুধ প্রয়োগ করেন। এরপর তাদের ওপর ওষুধের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করেন। একইসঙ্গে অন্য চার হাজার রোগীর অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা; যদিও এই চার হাজার রোগীকে ডেক্সামেথাসন দেওয়া হয়নি।
ফলাফল থেকে তারা দেখতে পান, ভেন্টিলেশন সাপোর্টে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ৪০ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুঝুঁকি কমিয়েছে এবং অক্সিজেন সমস্যায় থাকা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি ২৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে।
গবেষণা দলের প্রধান পর্যবেক্ষক অধ্যাপক পিটার হরবি বলেন, এখন পর্যন্ত এটাই একমাত্র ওষুধ যেটিতে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এটা খুবই যুগান্তকারী একটি ঘটনা। প্রধান গবেষক অধ্যাপক মার্টিন লন্ড্রে বলেন, ভেন্টিলেটরে থাকা রোগী এবং অক্সিজেন ঘাটতিতে থাকা রোগীদের জন্য এই ওষুধ আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ডেক্সমেথাসন প্রয়োগ করে এই ধরনের গুরুতর অসুস্থ রোগী মাত্র ১০ দিনে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য খরচও খুবই কম। হাসপাতালগুলোতে এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে বিলম্ব না করে ডেক্সামেথাসন প্রয়োগ করার পরামর্শ দেন তিনি। তবে চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ ব্যবহার না করা এবং অযথা কিনে বাড়িতে না রাখার প্রতি আহবান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে এই ওষুধের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, এই ওষুধটি বাংলাদেশের অনেক কোম্পানি তৈরি করে বাজারজাত করছে। এই ওষুধ সাধারণত শ্বাসকষ্টজণিত রোগ, হাঁচি , কাশি ও বুকে ব্যথা হলে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও হাঁপানি অ্যালার্জিজণিত বিভিন্ন রোগে এটা ব্যবহার করা হয়। এটি একটি স্টোরয়েড জাতীয় ওষুধ। এই ওষুধটি ব্যবহারে বেশ কয়েক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। সুতরাং এই ওষুধটি কোনোভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত হবে না।
