বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন হইতে শুরু করিয়া বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দল পালন করিয়াছে অগ্রণী ভূমিকা। তৃণমূল পর্যায়ে দলটির যে ব্যাপক জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা রহিয়াছে, তাহা ঈর্ষণীয়। গত এক দশকের অধিক সময় ধরিয়া দলটি ক্ষমতায় থাকিয়া এই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখিয়াছে। কিন্তু একশ্রেণির ‘কাউয়া’, বসন্তের কোকিল ও হাইব্রিড নেতাকর্মীদের নিয়া দলটি এখন বিপাকে পড়িয়াছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ প্রভৃতি অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সেই সকল নব্য নেতাকর্মীর যন্ত্রণায় দেশবাসী আজ অতিষ্ঠ। তাহারা তৃণমূলে ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া বেড়াইতেছেন এবং সরকারের ইতিবাচক অর্জনকে ম্লান করিয়া দিতেছেন। নষ্ট করিতেছেন দল ও সরকারের ভাবমূর্তি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি, মাদক ব্যবসা, জুয়া, জমি দখল, চোরাচালান, নির্মাণকাজ হইতে কমিশন দাবি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখা প্রকল্পে লুটপাটসহ এমন কোনো অপকর্ম নাই, যাহা তাহারা করিতেছেন না। সরকারি খাসজমি তো বটে, এমনকি প্রাইভেট জমিজমাতেও দলীয় অফিস নির্মাণের নামে তাহা দখল করিয়া লইতেছেন। অতীতে যাহারা একসময় ভিন্ন দল করিতেন, তাহারা এখন রাতারাতি ভোল পালটাইয়া এবং টাকার বিনিময়ে পদ-পদবি বাগাইয়া নিয়া আগের মতোই দিব্যি নানা অপকর্ম চালাইয়া যাইতেছেন। অচিরেই তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করিলে বর্ণচোরা এই সকল ব্যক্তি সরকার ও দলের জন্য বড়ো ধরনের মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়াইবে নিঃসন্দেহে।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৫৫ হাজার ভিন্ন মতাদর্শী আওয়ামী লীগ ও ইহার সহযোগী সংগঠনগুলিতে অনুপ্রবেশ করিয়াছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলিতে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের উত্তরসূরিরাও ঢুকিয়া পড়িয়াছে নানা কৌশলে। তাহারা সরকারি দলের মধ্যে থাকিয়া ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করিয়া ফেলিতেছে। দলের ভিতরে ঘাপটি মারিয়া থাকা এবং দলের সুনাম বিনষ্টকারী এমন ৫ হাজার নেতাকর্মী রহিয়াছেন, যাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ শুরু হয় গত বত্সরের নভেম্বরে। কিন্তু এখনো তাহাদের বহিষ্কার করা হয় নাই। তাহারা অনেক সময় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়া লাভ করিতেছেন। ফলে তাহারা কথায় কথায় সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখান, অন্যত্র বদলির হুমকি দেন। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এইভাবে বদলি করা হইলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাঙিয়া পড়িতে বাধ্য।
এই সকল ভুঁইফোড় ও অনুপ্রবেশকারী নেতাকর্মী দিয়া দল কখনো শক্তিশালী হয় না। তৃণমূলে জনগণের সমর্থনও ধরিয়া রাখা যায় না। তাহাদের কারণে দল ও সরকারের শ্রম হয় পণ্ড। তাহাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ চুপ করিয়া থাকে বটে, তবে তাহাদের মন হইতে ঘৃণা করে। তাহারা এতটাই ধূর্ত যে তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তাহারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি নিজেরাই ভাঙিয়া ফেলিয়া সত্ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেন এবং বদলিতে বাধ্য করেন। আধুনিক হাইব্রিড পদ্ধতিতে উত্পন্ন ফসল ও ফল-ফলাদির গুণমান যেমন ঠিক থাকে না, তেমনি রাজনীতিতে হঠাত্ আগত এই সকল হাইব্রিড নেতাকর্মীও মূল দলের গুণমান বহন করেন না। তাহাদের অস্থিমজ্জায় মিশিয়া থাকে অতীতে করিয়া আসা দলের আদর্শ ও চিন্তাচেতনা। তাহারা অনেক সময় দলে ঢুকিয়া পড়িয়া স্যাবোটাজ করেন, কাউন্সিলগুলিতে চেয়ার ছোড়াছুড়ি করেন। অতএব, তাহাদের গ্যাঁড়াকল হইতে অবশ্যই বাহিরে আসিতে হইবে।
