বাইরে করোনা, ঘরে ডেঙ্গু

প্রয়োজন সচেতনতা

আপডেট : ১৭ জুন ২০২০, ২১:৩১

বছরের শুরু থেকেই সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, তার নাম ‘করোনা’। সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও দেখা যায় না; কিন্তু তা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে গোটা পৃথিবীকে। বর্তমানে লকডাউন সেভাবে না থাকলেও মেনে চলতে হচ্ছে স্বাস্থ্যসচেতনতা। ঘরে থেকেও যেন শান্তি নেই, আছে পুরোনো শত্রু ‘ডেঙ্গু’। করোনার এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলার পদক্ষেপও এখনই নিতে হবে, না হলে চরম বিপর্যয়ে পড়বে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত অল্প দিনেই সুস্থ হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে অসুস্থতা বাড়তে থাকে এবং মৃত্যুও ঘটতে দেখা যায়, যেমনটা হয়েছিল গত বছর বর্ষাকালে। সাধারণত ভাইরাস জ্বরের যে লক্ষণ তার সবই ডেঙ্গু জ্বরে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে—সারা শরীরের মাংসপেশিতে বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথা, জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের সময়ে এলার্জি বা ঘামাচির মতো সারা শরীর জুড়ে লালচে দানা দেখা যায়। এ জ্বর কম বা বেশি উভয়ই হতে পারে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। খাবারে অরুচি ও বমি বমি ভাব হয়। সাধারণত জ্বর তিন-চার দিন পর ভালো হয়ে যায়, তবে রক্তের প্লেটিলেট কমতে থাকে। কখনো মাঝেমধ্যে বিরতি দিয়ে আবার জ্বর আসে এবং শরীরে রাশ দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রচণ্ড মাথাব্যথার সঙ্গে শরীরেও প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয় এবং জ্বর থাকে। কখনো চোখের পিছনে ব্যথা অনুভব করে। যাদের বেশি জ্বর থাকে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে যেমন চামড়ার নিচ, নাক, মুখ, দাঁত ও মাড়ি, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, কফ, বমি ও পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হতে পারে আবার রোগীর রক্তনালী থেকে প্লাজমা লিকেজের কারণে বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে। পানিশূন্যতা বেশি হওয়ায় প্রসাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে, অনেক সময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনিতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। চিকুনগুনিয়া সাধারণত দ্বিতীয় বার হয় না তবে ডেঙ্গু দ্বিতীয় বার হলে জটিলতা আরো বেড়ে যায় বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।

করোনা এবং ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রায় কাছাকাছি। কোভিড-১৯ সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট বায়ুকণা (Respiratory Droplets) থেকে ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত ব্যক্তির জীবাণু হাঁচি-কাশির কারণে বা জীবাণুযুক্ত হাত দিয়ে স্পর্শ করার কারণে পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুর পৃষ্ঠতলে লেগে থাকলে এবং সেই ভাইরাসযুক্ত পৃষ্ঠতল অন্য কেউ হাত দিয়ে স্পর্শ করে নাকে-মুখে-চোখে হাত দিলে করোনা ভাইরাস নাক-মুখ-চোখ দিয়ে দেহে প্রবেশ করে। আক্রান্ত হওয়ার দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়; গড়ে পাঁচ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা যায়। ব্যাধিটির সাধারণ উপসর্গ হিসেবে জ্বর, শুকনো কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে মাংসপেশীর ব্যথা, গলায় ব্যথা, সর্দি, পেটের পীড়া দেখা যেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো নমনীয় আকারে দেখা যায়; কিন্তু কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুস প্রদাহ (নিউমোনিয়া) এবং বিভিন্ন অঙ্গের বিকলতাও দেখা যায়। সাধারণত বর্ষাকালে শহর এলাকায় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়। এজন্য বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে করোনা টেস্টের পাশাপাশি ডেঙ্গুর টেস্ট করাও জরুরি, বিশেষত শহরাঞ্চলে। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও সেরকম নির্দেশনা দিয়েছে।

খুবই সাধারণ কিছু নিয়মকানুন যা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সবসময় সবার সচেতনতার জন্য প্রচারিত হয় এগুলো মেনে চলে আমরা ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি। আক্রান্ত রোগীকে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা দেওয়াসহ নতুনভাবে এ রোগের জীবাণুবাহী মশার আরো প্রসার না ঘটে সেজন্য সবাইকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাসার পাশে, ছাদে, পরিত্যক্ত জিনিসের ভেতর, ফুলের টব, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ, বাথরুম ইত্যাদি জায়গায় যেন পানি না জমে থাকে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। অন্তত তিন দিনে এক বার এসব জায়গা পরিষ্কার করতে হবে। করোনার জন্য স্বাস্থ্যসচেতনতা (ঘনঘন সাবান-পানি বা ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরা, যথাসম্ভব বাসায় থাকা, হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার ইত্যাদি) মেনে চলার পাশাপাশি বাসাবাড়ি এবং উল্লিখিত স্থানসমূহও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এডিস মশা সকালে ও সন্ধ্যায় বেশি কামড়ায়, তাই এ সব সময়ে বেশি সচেতনতা প্রয়োজন।

n লেখক :চিকিত্সক