সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে সচেতন নয় পাকিস্তান!

আপডেট : ১৭ জুন ২০২০, ২২:৩৫

২০১৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে বন্দুকধারীরা আক্রমণ চালিয়ে সেখানকার শান্তিকে টুকরো টুকরো করেছিল। তারা পাকিস্তানের স্কুলগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা টানা আট ঘণ্টা ধরে পাকিস্তানের তেহরিক-ই তালিবানের সন্ত্রাসীরা টেবিলে নিচে লুকিয়ে থাকা বাচ্চাদেরও খুঁজে খুঁজে গুলি করে হত্যা করেছে। এতে প্রায় দেড়শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল শিশু।

সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন পাকিস্তানকে দ্বি-মুখী আচরণের জন্য চাপ দেয়, তখন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা প্রায়শই ছত্রভঙ্গ হয়ে এর প্রতিক্রিয়া দেখান। তারাও বলে থাকেন যে, পাকিস্তানও সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শত শত পাকিস্তানি সেনা এবং অসংখ্য বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ কথা পুরোপুরি সত্য।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রায় ১১ বছর আগের কথা, কেবলমাত্র জঙ্গি গোষ্ঠী দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার জন্য পাকিস্তানি তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতা চেয়েছিলেন পাকিস্তানি রাজনীতিবিদরা। সেই সঙ্গে দেশটির ওই আর্মি পাবলিক স্কুলের পক্ষ থেকে গণহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল।

ওই গণহত্যার বিষয়ে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছে পাক সেনাবাহিনীরা। রাজনীতিবিদরাও এ হামলার নিন্দা করেছিল এবং পরের দিন তিরাহ উপত্যকার একটি জঙ্গি শিবিরে বিমান হামলা চালিয়ে ৫৭ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছিল। সেখানে এক ব্যক্তির আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল, যিনি পাকিস্তানের তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানের সাবেক মুখপাত্র এহসানউল্লাহ এহসান। এবং এহসান ওই স্কুলে হামলাসহ পাকিস্তানের উপর আরও অনেক রক্তাক্ত হামলার ঘটনাস্থলের সঙ্গে জড়িত ছিল।

২০১২ সালের একটি উদাহরণ বলা যায়, মালালা ইউসুফজাইয়ের মাথায় গুলি করার দায় স্বীকার কার দলের মধ্যে একজন ছিলেন  এহসানউল্লাহ এহসান। ওয়াগাহ সীমান্ত চৌকের কাছে অন্তত ৬০ জন মানুষকে হত্যা করেছিলেন এমন একটি দলের সদস্য ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনেই পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন।

এহসানের সঙ্গে কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হওয়ার পরে, তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বার্থ হয়ে ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। খুব সম্ভবত এহসানকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সন্ত্রাসের সঙ্গে আন্তরিকভাবে একটি জঙ্গি বিরোধী যুদ্ধে জয় হয়েছিলেন।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় যে, বর্তমান পরিস্থিতি এটি প্রমাণ করে না। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এহসান ঘোষণা দিয়েছেন, যে তিনি পাকিস্তানের জেল থেকে পালিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, একটি তিন বছরের চুক্তির মধ্য দিয়ে আমি ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পন করি। কিন্তু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ আমাকে আমার বাচ্চাদের সঙ্গে কারাগারে রেখেছিল এবং সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছিল।

এহসান বলেছিলেন, তিনি পালিয়ে গিয়ে তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: অক্সফোর্ডের করোনা টিকার কার্যকরী মেয়াদ কতটুকু?

পেশোয়ার গণহত্যায় নিহত শিশুদের পিতা-মাতাদের কাছে এটি শুধু অবাক হওয়ার মতো নয়, হতাশাজনকও বটে। কারণ ২০১৪ সালের গণহত্যায় নিহত এক শিশুর পিতা ফজল খান বলেন, এহসান উল্লাহ একজন সাধারণ কয়েদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী। তিনি সারা বিশ্বে তেহরিক-ই তালেবানের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত। যিনি অনেকগুলো সন্ত্রাসী হামলার দায় নিয়েছিলেন।

তবে ভারতের জি নিউজ জানিয়েছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সর্বশেষ তথ্যমতে এহসানউল্লাহ আফগান নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে একটি বিশেষ অভিযানে অংশ নিতে ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন। সংবাদে বলা হয়, এহসানের বক্তব্য তুরস্কের জনগণকে বিভ্রান্ত করবে।

আরও পড়ুন: তাঁবু ভাঙা নিয়ে শুরু হয় ভারত-চীন সংঘর্ষ!

গোয়েন্দা ব্যুরোর প্রাক্তন বিশেষ পরিচালক অরুণ চৌধুরী বলেছেন, এহসান সে পাকিস্তান বা তুরস্কে যেখানেই অবস্থান করুক, এটা স্পষ্ট যে পাকিস্তান তাদের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডকে আরও সহজ করে দিয়েছে।

অরুণ চৌধুরী ঠিকই বলেছেন। এর কারণে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পাকিস্তান সরকার শুধু তার নিজস্ব লোকদের সঙ্গেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং আফগান শান্তি প্রক্রিয়াও প্রভাব পড়েছে।

আরও পড়ুন: লাদাখে আর কোনও সংঘর্ষ দেখতে চায় না চীন !

আফগানিস্তানের টলো নিউজ অনুসারে, তালেবানরা আফগানিস্তানের ২৯টি প্রদেশে ২২২টি জায়গায় হামলা চালিয়েছে এবং ১৭১ জন নিরাপত্তা বাহিনীকে হত্যা করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলিতে তালেবানরা তাদের আক্রমণ আরও তীব্র করেছে।

পাকিস্তানের মাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী একজন ব্যক্তি জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় দেশটির এখন তার রাজধানীকেই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করা উচিত। যতক্ষণ না পর্যন্ত পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে না আসে এবং এটিকে দেশে ও বিদেশে সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়বদ্ধ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও কোনও শান্তি থাকবে না। কেবল মাত্র সন্ত্রাসী হামলার শিখার ব্যক্তিরাই পাকিস্তানের ভালো চান না, বরং সকল পাকিস্তানিই দেশটির ভালো চান।

লেখক:

মাইকেল রুবিন,
ব্লগার, ওয়াশিংটন এক্সামিনার।
শিক্ষক, আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট।
সাবেক কর্মকর্তা, পেন্টাগন।

ইত্তেফাক/আরআই