গাংনী উপজেলার ৩ নম্বর কাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রাহাতুল্লাহ বিশ্বাসকে জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ইউপি কার্যালয়ে আটকে রেখে সরকারি ১ হাজার ২০০ বস্তা চালের বিপরীতে স্বাক্ষর আদায় করে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শারীরিকভাবে অসুস্থ ইউপি চেয়ারম্যানকে বাড়ি থেকে জিম্মি করে তুলে আনেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রউফ স্বপন, যিনি আড়পাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। নিজেকে তিনি এমপির বিশেষ প্রতিনিধি পরিচয় দেন। মঙ্গলবার সকালে তার নেতৃত্বে ১০টি মোটরসাইকেলযোগে ২০-২৫ জন সন্ত্রাসী চেয়ারম্যানের বাড়িতে যায়। তারা তাকে বাড়ি থেকে ধরে এনে ইউনিয়ন পরিষদে বন্দি করে রাখে এবং জোর করে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার ১ হাজার ২০০ বস্তা ত্রাণের চালের তালিকায় স্বাক্ষর আদায় করে নেয়। এ সময় চেয়ারম্যান যাতে কাউকে ফোন করতে না পারেন, সে জন্য তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে বন্ধ করে রাখে।
পাশাপাশি ইউপি সচিব আবদুর রহমানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করাসহ পরিষদে লাঞ্ছিত করা হয় এবং মোটরসাইকেল তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এক পর্যায়ে আবদুর রউফ স্বপন ও বেতবাড়িয়া গ্রামের আলাইহীমের ইন্ধনে রাজু আহমেদ নামের এক ক্যাডার পরিষদের মধ্যে থাকা দুই বস্তা ভিজিএফের চাল চুরি করে নিয়ে যায়। বেতবাড়িয়া বাজার থেকে সেই চুরির চাল উদ্ধার এবং রাজু আহমেদকে আটক করা হয়। মোবাইল কোর্ট তাকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠায়।
ইউপি মেম্বারদের পক্ষে সাইদুল ইসলাম জানান, এই চক্র এর আগেও পরিষদে ঢুকে কম্বল ও চাল ছিনতাই করেছিল। গাংনী থানায় মুচলেকা দিয়ে তারা সেবার ছাড়া পেয়েছিল।
ইউপি সচিব আবদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিনের ন্যায় মঙ্গলবার সকালে পরিষদের কর্মস্থলে উপস্থিত হলে আবদুর রউফ স্বপনের নেতৃত্বে বেতবাড়িয়া গ্রামের জেলদাগী আওয়ামী লীগ নেতা আলাইহীম, রাজু আহমেদ, নওশাদ আলী, জাহিদ আলী, মুকুল, জিয়া, রিপন, জিন্নাহ, বাবু, কাজীপুরের রুহুল, জুয়েল, আনার, মঙ্গল, সাহেবনগরের এরশাদ, সজীব, আতিয়ারসহ ২০-২৫ জন মোটরসাইকেলযোগে এসে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে আমাকে নিয়ে চেয়ারম্যানকে বাড়ি থেকে জোরপূর্বক হাইজ্যাক করে পরিষদে নিয়ে আসে। এ সময় তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে রাখে। দুর্বৃত্তরা প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার ত্রাণের তালিকা থেকে অবৈধভাবে চাপ প্রয়োগ করে ইউনিয়নের প্যাডে ১ হাজার ২০০ বস্তা চালের বিপরীতে চেয়ারম্যানের সম্মতি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। তাদের দাবি, সরকারি ত্রাণের চালের মধ্যে ৩০ ভাগ চাল দিতে হবে। নইলে ত্রাণ বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমি এদের বিরুদ্ধে মামলা করব।’
ইউপি চেয়ারম্যান রাহাতুল্লাহ জানান, ‘আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়ি থেকে জোরপূর্বক তুলে পরিষদে এনে জোর করে প্যাডে ১ হাজার ২০০ বস্তা চালের বিপরীতে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার এলাকায় ৪ হাজার ১১৯ জনের ত্রাণ বিতরণের অনুমতি পেয়েছি। ওরা আমার ফোনটি পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি এদের শাস্তি দাবি করছি।’
ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক খবিরউদ্দীন জানান, পরিষদে ঢুকে সচিবকে স্যান্ডেল দিয়ে মারা হয়েছে। এতে দলের ও ইউনিয়নের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছে। উপজেলা যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুল আলিম জানান, চাল চুরির ঘটনায় স্বপন মাস্টার ও আলেহীম জড়িত রয়েছে। এদের বিচার হওয়া দরকার। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক হাফিজুর রহমান জানান, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছে। এদের কর্মকাণ্ডে ইউনিয়নের চাল চুরির বদনাম ছড়িয়ে পড়েছে। বক্তব্য জানতে আবদুর রউফ স্বপনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গাংনী থানার ওসি ওবাইদুর রহমান জানান, ‘অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
