মামণি তোমায় স্মরণ করি

আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ২২:০০

প্রতিটি মানুষের মনের মণিকোঠায় নানা স্মৃতির একটি ভাণ্ডার থাকে। স্মৃতিগুলো কোনোটা সুখের কোনোটা দুঃখের। নিজের অজান্তেই মানুষ কখনো কখনো তার মূল্যবান স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে পছন্দমতো কিছু স্মৃতি রোমন্থন করে সুখ পায়। তেমনি আমারও একটি স্মৃতির ভাণ্ডার আছে, যার বেশির ভাগটা জুড়ে আছে আমার মামণির স্মৃতি। তার কিছু অজানা ব্যক্তিগত জীবনের কথাই আমি পাঠকদের জানাচ্ছি।  

গতকাল ছিল ১৮ জুন। ১৮ বছর আগে অর্থাত্ ২০০২ সালের ১৮ জুন আমাদের মামণি ড. নীলিমা ইব্রাহিম ইহজগত্ ত্যাগ করেন। আমি ঈশ্বরের কাছে ওনার আত্মার শান্তি কামনা করি। আমরা বোনেরা তাকে মামণি বলে ডাকতাম। এখানে আমিসহ আমার বোনেদের নামগুলো তাদের বয়স অনুযায়ী উল্লেখ করলাম। মনজুরা কবির, ডলি ইব্রাহিম, সিতারা আহসানউল্লাহ , রীতি ইব্রাহীম আহসান ও ইতি ইব্রাহিম খান। আমি তার চতুর্থ কন্যা রীতি। এর ভেতর ডলি মামণি বেশি আদরের ছিল। আসলে ছোটোবেলা থেকে রুগ্ণ স্বাস্থ্যের হওয়ায় মামণি ওর প্রতি একটু বেশি যত্নবান ছিলেন।

মামণি ছিলেন আমাদের চালিকাশক্তি। এমন একটি দিনও যায় না যেদিন মামণিকে স্মরণ করি না। খুলনা করনেশন স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে চারটি বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেছিলেন তিনি। ওনার এ সাফল্যের জন্য পরদিন স্কুল ছুটি দেওয়া হয়। এরপর মামণি কলকাতা ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন থেকে আইএ পাশ করে যখন অর্থনীতি নিয়ে অনার্স পড়ছিলেন তখন তার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিজের মাকে সেবা করে সুস্থ করে তোলার জন্য উনি পড়াশোনা ছেড়ে মায়ের সেবায় নিয়োজিত হন। কিছুটা বিরতি দিয়ে পরে উনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। মামণির সঙ্গে আমার বাবার বিয়ে হয় ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। সে সময় বাবা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ক্যাপটেন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মামণি তখন কলকাতা ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে কর্মরত ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শুরু করেছিলেন। চাকরি ছেড়ে এবং পিএইচডি অসমাপ্ত রেখে মামণি ১৯৪৬ সালে বাবার সঙ্গে ঢাকা চলে আসেন। শুনেছি আমার মায়ের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবকে সম্মান দেখিয়ে বিয়ের কিছুদিন পর বাবা সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। আমরা যখন খুলনায় ছিলাম তখন মামণি তার পিএইচডি শেষ করার চিন্তা করেন। তার পিএইচডির গাইড ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য। মামণি ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। আমরা পাঁচ বোন ভাগ করে থাকতাম। কেউ কেউ ঢাকায় মামণির সঙ্গে আর বাকিরা বাবার সঙ্গে খুলনায়।

মামণি সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসে রান্না করে আমাদের খাইয়ে দিতেন। এত খাটুনির পরও গল্প বলে আমাদের ঘুম পাড়াতেন। তারপর মামণি পড়তে বসতেন। খুব ভোরে ঘুম ভাঙলে দেখতাম, টেবিলে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। তার মানে উনি সারা রাত বিছানায় যাননি। মামণিকে মাঝে মাঝে কলকাতা গ্রন্থাগারে পড়াশোনা করতে সেখানে যেতে হতো। আমাকে খুলনায় রেখে আমার বড়ো বোন ও ছোটো বোনকে নিয়ে উনি কলকাতা যেতেন। মামনি সারা দিন থাকতেন বিভিন্ন গ্রন্থাগারে আর আমার বড়ো বোন ছোটো বোনকে দেখে রাখতেন। মামণি পিএইচডি শেষ করেন ১৯৫৯ সালে।

আমার মামণি ছিলেন অত্যন্ত সত্, অসমসাহসী ও কঠোর পরিশ্রমী একজন মানুষ। একসময় ইলেকশন করে উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৫৯ সালে আমার বাবা নর্থ ব্রুক হল রোডে একটি ছোটো বাড়ি কেনেন এবং খুলনার আবাস ছেড়ে দিয়ে ১৯৬০ সালে আমাদের সবাইকে নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। তখন আমার বড়ো বোন মনিজা রহমান মহিলা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করে হলিক্রস কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চমাধ্যমিক পড়ছেন। বাকিরাও যার যার মতো স্কুলে পড়ছে। আমাদের বাসায় বই পড়াকে খুব উত্সাহ দেওয়া হতো। একবার আমাদের পাঁচ বোনের মধ্যে চার বোনের একসঙ্গে চিকেন পক্স হয়েছিল। সেইবার বাসায় একসঙ্গে অনেক বই এসেছিল। অসুখের যন্ত্রণা ভুলে গিয়েছিলাম অনেক নতুন বই আর মামণিকে কাছে পেয়ে। আমার বেশ মনে পড়ে, একটা সময় ছিল বাবা ও মামণিকে ধরে ভাবতাম আমরা সাত ভাইবোন। নিয়ম করে সবাই একসঙ্গে বেড়াতে যেতাম, সিনেমা দেখতে যেতাম। এর মধ্যে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোড়ের বাসস্থানে উঠে এসেছি। মামণি আমাদের উত্সাহ দিতেন গাড়ি চালানো শিখতে। আমার বড়ো দুই বোন তাদের প্রবেশিকা পরীক্ষার পর তিন মাসের জন্য চাকরি করেছে। আমার তৃতীয় বোন সিতারা আর্ট কলেজে পড়ার পুরোটা সময়ই পার্টটাইম চাকরি করত। এভাবেই মামণি আমাদের বাস্তববাদী করে তুলেছিলেন।

এর ভেতর ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পেরিয়ে এলো একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালরাত্রি। তারপর চলল বীভত্স নয় মাস। তখন মামণি প্রতি রাতেই বাড়তি খাবার রাখতেন, যদি কেউ খেতে আসে। এমনও হয়েছে, টেবিলের সব খাবারই মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে গেছেন; আমরা পাউরুটি চিনি খেয়ে খিদে মিটিয়েছি।

আমার মামণি ছিলেন নির্লোভ। একবার পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক এক সেমিনারে কুমিল্লা গিয়ে উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাবা সঙ্গেই ছিলেন। ওনাকে কুমিল্লা সিএমএইচে আনা হলো। উনি হূদেরাগের রোগী, তাই সেনাবাহিনীর তরফ থেকে ওনাকে হেলিকপটারে করে ঢাকা আনার প্রস্তাব করা হলো। উনি জানতে চাইলেন খরচ কত হবে। সবার হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও উনি অ্যামবুলেন্সে করে সোজা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আইসিইউতে এলেন। সেইবার মামণি ছয় সপ্তাহ লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। অ্যামবুলেন্সের টাকাটা উনি সুস্থ হয়ে দিয়ে দেন।

তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে আমার মহীয়সী মামণি হয়তো অনেক কিছুই করতে পারতেন না, যদি না আমার বাবার একনিষ্ঠ সমর্থন না পেতেন। অত্যন্ত নীরবে তিনি মামণিকে সব বিষয়ে সমর্থন দিয়ে গেছেন। আমার একটা দুঃখ কখনোই যাবে না যে আমি তার জীবনের শেষ সময়গুলোতে তার কাছে ছিলাম না। মামণি, তুমি যেখানেই থাকো শান্তিতে থাকো। তোমার আদর, তোমার যত্ন, তোমার পড়ানো বংলা ব্যাকরণ, সব মনে পড়ে। তুমি জীবিত আছ আমার প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রতিদিন, প্রতি দণ্ডে, প্রতি পলে।

n লেখক :ড. নীলিমা ইব্রাহিমের মেয়ে