পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের একটি চিঠি গণমাধ্যমে ফাঁস হইয়াছে। অতঃপর এই ঘটনা কিছু উদ্বেগের জন্ম দিয়াছে। ঐ চিঠি গণমাধ্যমে কীভাবে ফাঁস হইল—এই কারণে গঠিত তদন্ত কমিটি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করিয়াছে একাধিক সাংবাদিককে। ইহা যাহার পর নাই উদ্বেগের।
কোনো সরকারি তথ্য যদি ফাঁস হয়, তাহা হইলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচিত নিজেদের আয়নায় মুুখ দেখা। তাহাদের ভিতর হইতে কেহ যদি ঐ তথ্য ফটোকপি করিয়া কিংবা মোবাইলে ছবি তুলিয়া ফাঁস না করিত, তাহা হইলে উহা কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যমে আসিবার সুযোগ পাইত না। সুতরাং সর্বপ্রথমে নিজেদের ঘরের দিকে তাকানো উচিত। মনে রাখিতে হইবে, দেশের প্রচলিত আইনে সাংবাদিকদের নিকট তথ্যের সূত্র জানিতে চাহিবার নিয়ম নাই। দুর্নীতি প্রকাশ ও স্বচ্ছতার স্বার্থে সূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা একজন সাংবাদিকের বিশেষ দায়িত্বের অংশ। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা বিষয়ে তদারকিমূলক অথবা আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য রহিয়াছে প্রেস কাউন্সিল। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট, ১৯৭৪ অনুযায়ী কোনো তথ্যের সূত্র জানিতে চাহিবার ক্ষমতা দেওয়া হয় নাই উক্ত প্রতিষ্ঠানটিকেও। অন্যদিকে সাংবাদিকতার নীতিমালা লঙ্ঘনের সম্ভাব্য অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের বিধানগুলি ঐ আইনের ১৩ ধারায় বর্ণিত হইয়াছে। উহার ২ উপধারায় বলা হইয়াছে—কোনো সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, সম্পাদক ও সাংবাদিককে প্রকাশিত তথ্যের সূত্র প্রকাশে বাধ্য করা যাইবে না। সুতরাং গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটিতে একাধিক সাংবাদিককে তলব করাটা সমীচীন হয় নাই।
একটি দেশের স্বচ্ছতার সবচাইতে বড়ো দর্পণ ঐ দেশটির গণমাধ্যম। এই দর্পণকে ঝাপসা করা যাইবে না। এমনিতেই মুক্ত গণমাধ্যমের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সকলের নিচে। ইহা অত্যন্ত লজ্জার। প্রতিবেশী বৃহত্ গণতন্ত্রের দেশে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের সূত্রের কিছু ঘটনা উল্লেখ করা যাইতে পারে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতের দিল্লি বিধানসভা স্পষ্ট করিয়াছে—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার, এইগুলি পাঠ্যবইয়ের বিষয় নহে, দৈনন্দিন কর্মজীবনে চর্চার বিষয়। ২০১৯ সালের মার্চে ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল সুপ্রিম কোর্টে বলিয়াছিলেন, রাফাল চুক্তি লইয়া ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় যেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হইয়াছে, তাহার ভিত্তি হইল গোপন এবং চুরি যাওয়া নথি। কিন্তু ঐ নথি প্রকাশকারী হিন্দু পাবলিশিং গ্রুপের চেয়ারম্যান এন রাম সুপ্রিম কোর্টকে বলিয়াছেন, অফিশিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট হইল ব্রিটিশরাজের চালু করা জঘন্য কালা আইন। এইদিকে, গত বত্সর অক্টোবরে সরকারি গোপনীয়তা ও সংবাদমাধ্যমের বাক্স্বাধীনতা খর্ব করিবার বিরুদ্ধে অভিনব এবং জোটবদ্ধ প্রতিবাদ জানাইয়াছিল অস্ট্রেলীয় দৈনিকগুলি। সেই দিন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি কাগজেরই প্রথম পাতা জুড়িয়া সবকিছু ছিল কাটা। উপরে সরকারি সিলমোহরের ছাপ (নকল), তাহাতে লেখা ছিল—‘সিক্রেট, নট ফর রিলিজ’।
আমরা মনে করি, কোনো সাংবাদিককে তাহার তথ্যের সোর্সের ব্যাপারে ডাকিয়া জিজ্ঞাসাবাদ না করিয়া সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচিত নিজেদের সংশোধন করা। একই সঙ্গে কোনো সাংবাদিকের রিপোর্ট যদি রাষ্ট্র ও জনগণের পক্ষে যায়, তাহা হইলে তাহাকে বরং পুরস্কৃত করা উচিত। আমাদের দর্পণকে ঝাপসা হইতে দেওয়া যাইবে না।
