করোনা-উত্তর বিশ্বে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা

আপডেট : ১৯ জুন ২০২০, ২১:৪৬

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশ্ব আজ শতাব্দীর ভয়াবহতম অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে। জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়নে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে ১৭ লাখ অভিবাসী শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গত কয়েক মাসে নতুন কর্মী প্রেরণ বন্ধের পাশাপাশি কর্মী গ্রহণকারী দেশসমূহে হাজার হাজার অভিবাসী কর্মী চাকরি, ব্যবসা বা জীবিকা হারিয়েছেন। সেইসঙ্গে কর্মী গ্রহণকারী দেশসমূহ অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত নেওয়ার জন্য চাপ দিলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থায় এরই মধ্যে বেশ কয়েক হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী মাসগুলোতে এ ধরনের ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, মার্চ এবং এপ্রিল মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ১২ ও ২৫ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশের ১ কোটি ২০ লাখের বেশি অভিবাসী বিশ্বের প্রায় ১৬২টি দেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন। যাঁরা এ সময়ে চাকরি শেষে দেশে ফিরেছেন তাঁরাও এ হিসেবের অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) ২০১৯ সালে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা দেখিয়েছে ৭৮ লাখ, যা বর্তমানে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি অভিবাসীর প্রকৃত সংখ্যা (স্টক অব মাইগ্রেন্ট) প্রকাশ করে। তবে সংখ্যা যাই হোক—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অভিবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স পরিবারের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছে। বস্তুতপক্ষে, প্রতি বছর গড়ে ৬-৮ লাখ লোকের কর্মসংস্থান এবং ১৫-১৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন—এ পরিসংখ্যান দুটি জাতীয় অর্থনীতিতে অভিবাসন ও অভিবাসীদের অবদান প্রমাণে যথেষ্ট।

কভিড-১৯ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারকে নতুন রূপ দিতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকগণ বলছেন, যেখানে অনিয়মিত অভিবাসীগণ স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হবেন, আধা-দক্ষ বা স্বল্প-দক্ষ অভিবাসী কর্মী ব্যাপকহারে চাকরিচ্যুত হবেন এবং দক্ষ ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসীগণ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে টিকে থাকবেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কর্মী গ্রহণকারী দেশসমূহ কভিড-১৯ পরবর্তী সুযোগটি কাজে লাগাতে সচেষ্ট হবে—যাতে নিজ দেশের লোকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে কর্মে নিয়োজিত করার প্রবণতা জোরদার হবে।

তবে এ কথা সত্য যে, মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শ্রমিক গ্রহণকারী দেশসমূহ দুর্যোগ কাটিয়ে দ্রুততর সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করবে—যা অভিবাসী শ্রমিকদের কাজে লাগিয়েই করতে হবে। তাই করোনা পরবর্তী দিনগুলোতে পর্যটন, নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে কর্মীর চাহিদা পূর্বাবস্থায় চলে আসতে পারে। তবে ভ্রমণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন এবং এ সংশ্লিষ্ট সেবাখাতের চাহিদা পূর্বাবস্থায় আসতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, আইটিসহ বেশকিছু খাতে কর্মীর দাহিদা বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের বাইরে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে কতিপয় সেক্টরে অভিবাসী কর্মীর চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্যখাতের মোট কর্মীর ২০ ভাগ অভিবাসী। গবেষকদের ধারণা, করোনাউত্তর পৃথিবীতে অন্যান্য সেক্টরের সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে অভিবাসীদের চাহিদা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ লাখ এবং যুক্তরাজ্যে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হবে, যা স্থানীয়ভাবে মেটানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায়, বাংলাদেশের মতো বৈদেশিক চাকরি ও রেমিট্যান্সনির্ভর দেশসমূহের জন্য পরিবর্তিত সম্ভাব্য খাত ও চাহিদাকে লক্ষ্য করে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

পিএইচডি গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউকে