ড. মো. হুমায়ুন কবীর
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে বর্তমানে সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত এমন লোকের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ। তাছাড়া দেশের অর্থনীতির মোট যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি রয়েছে, তার মধ্যে কৃষি, শিল্প ও বিদেশি রেমিট্যান্সই প্রধান। শিল্পের মধ্যে যেমন ক্ষুদ্র, মাঝারি, ভারী প্রভৃতি ভাগ রয়েছে; তার মধ্যে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কৃষি খাতের পুরোটাই কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিভিত্তিক। সেখানে কৃষকদের মধ্যে ভূমিহীন, মাঝারি, ক্ষুদ্র, বড়ো—এমন অনেক ধরনের কৃষক রয়েছেন। আবার কৃষির রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপখাত—মত্স্য, প্রাণিসম্পদ এবং এসব খাতের ছোটো-বড়ো অনেক খামারি।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধারণা করছে, বিশ্ব জুড়ে করোনার কারণে যে সংকট সৃষ্টি হবে, তার প্রাথমিক ধাক্কাটা আসবে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। আর সেটির কারণে বিশ্বে বিরাট খাদ্য ঘাটতিই শুধু নয়, দেখা দিতে পারে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন দুর্যোগের পরে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ নিত্যনৈমিত্তিক হিসেবে দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছিল, যা আমরা সবাই জানি। বস্তুত, এই করোনার প্রাদুর্ভাবকে একটি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করে এটিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলে মনে করছেন অনেকে। আর এই যুদ্ধের কারণে খাদ্যের সংকট সৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কৃষিই একমাত্র ভরসা। বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষির যে অবস্থা, সেটিকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারলে তা দিয়ে আমাদের দেশের দুর্ভিক্ষ তো বটেই, উপরন্তু আরো পার্শ্ববর্তী অনেক দেশকে সহযোগিতা করা যাবে।
আমাদের দেশটি সুজলা-সুফলা শস্যশ্যামলা। কৃষির জন্য এর মাটি, জল, আবহাওয়া খুবই উপযোগী। সেজন্য দেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু মনে করতেন এবং এখন তারই কন্যা কৃষকরত্ন শেখ হাসিনাও তাই মনে করেন। তিনি তার বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন সে কথা। বাংলাদেশের এমন উর্বর মাটিই হতে পারে এই সময়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এটি উপলব্ধি করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেশের চলমান বর্তমান কৃষি উত্পাদন অব্যাহত রাখতে তাদের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন কৃষিবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে কৃষি প্রণোদনা উল্লেখযোগ্য। স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, মত্স্য খামারি, হাঁস-মুরগির খামারি, গরু-ছাগল খামারি, দুগ্ধ খামারিসহ সবার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এই বোরো মৌসুমেই কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণের ঘোষণা দিয়েছে।
এ দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষিকে অব্যাহত রেখে দেশের অভ্যন্তরেই শুধু নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সেজন্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের কৃষকের কৃষিকাজ অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই হয়তো আমরা উত্পাদন বা তৈরি করতে পারি না। কিন্তু আমরা কৃষিপণ্য সহজেই উত্পাদন করতে পারি। এটিকে আমরা কৃষিযুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করতে পারি। আর এর সম্মুখযোদ্ধা হলেন আমাদের গর্বিত কৃষক ভাই। অন্য সব যুদ্ধে যেভাবে আমরা বিজয় অর্জন করেছি, এই করোনা যুদ্ধেও আমরাই জয়ী হব—সেটিই প্রত্যাশা।
n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
