ফারহানা নওশিন তিতলী
‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতে, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না। জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা, মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না। আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়...।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া এই গানটি সন্তানদের এক অসীম নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে দেয়। গানটি শোনা মাত্রই প্রতিটি সন্তানের বাবার সঙ্গে কাটানো সেই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যাদের বাবা পৃথিবীতে আছেন তাদের মন ছুটে যায় বাবার কাছে, আর যারা তাদের বাবাকে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে তারা স্মৃতিচারণ করে বাবার রাগ, ভালোবাসা, শাসন সবকিছুকে। আর মনে মনে স্বপ্ন দেখেন আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই বাবার স্নেহময় শৈশবে।
বাবাকে আসলে কোনোভাবেই সঙ্গায়িত করা যায় না। যে কাউকে এই প্রশ্নটি করলে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে উত্তরটি হবে এমন যে বাবা মানে তো বাবাই। বাবা কথাটির আংশিক সংজ্ঞা দেওয়া যায় এভাবে যে স্নেহ, শাসনের অনাবিল প্রশ্রয়ের নাম বাবা। বাবা মানেই এমন এক শক্ত খুঁটি, যার ওপর পাহাড়সম দায়িত্ব আর সাগরসম মমতায় গড়ে ওঠে সন্তানের পরম নির্ভরতার ছাউনি। একটি সন্তান জন্মানোর সঙ্গে জন্ম হয় একজন বাবারও। এতদিন যিনি ছিলেন একজন বাবার সন্তান, নিজের সন্তান জন্মের পর তিনি নামেন বাবার ভূমিকায়। এই পরিবর্তন বদলে দেয় অনেক কিছু। বদলে দেয় তার বাবা হওয়ার আগের জীবনধারা। বাবারা সাধারণত একটু বেশিই দায়িত্বশীল হন। সন্তানদের ভবিষ্যত্ এবং সংসারের নিত্যদিনের চাহিদা পূরণ করায় যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। নিজের ছোটো ছোটো চাহিদাগুলোকে আড়াল করে সন্তানের মুখের হাসির জন্য বাবারা নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তার অন্তরের যেন একটায় নিবেদন ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধ ভাতে’
জুন মাসের তৃতীয় রবিবার। এ দিনটিতে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাবা দিবস পালন করা হয়। ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস হিসেবে পালন করা হবে। ছয় বছর পর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্স এটিকে আইনে পরিণত করে।
বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। বাবাকে ভালোবাসার জন্য আসলে কোনো দিবসের প্রয়োজন হয় না। বাবার ক্ষেত্রে যেমন সন্তানকে ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোনো দিন বা তিথি নেই, সন্তানের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই। বাবারা সাধারণত একটু গম্ভীর হয়। বাইরে থেকে তাদের দেখে মনে হয় কাজ ছাড়া যেন তারা কিছুই বোঝে না। মায়েদের ভালোবাসা যেমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বোঝা যায় বাবাদের ক্ষেত্রে কিন্তু ঠিক তার বিপরীত। বাবার মনের মমতাকে বুঝতে হলে বাবার মতো সন্তানেরও বিশাল বড়ো মমতা ভরা একটা হূদেয়র দরকার হয়। বাবার সঙ্গে একটু সময় কাটালেই বোঝা যায় সন্তানের প্রতি বাবাদের ভালোবাসাটা কত গভীর। খাবার টেবিলে মা যখন মাছের বড়ো টুকরাটা বাবার প্লেটে তুলে দেয়, সন্তানকে রেখে বাবা কিন্তু সেই বড়ো মাছের টুকরাটা হজম করতে পারে না। নানা অজুহাত দেখিয়ে সন্তানকেই ভালো খাবারগুলো খাইয়ে নিজেকে আত্মতৃপ্ত করেন। বাজার করার সময়ও তার ছেলেমেয়েদের পছন্দের খাবারগুলোর অগ্রাধিকার থাকবেই।
বাবারা সারাজীবন ব্যস্ততায় কাটিয়ে দিলেও শেষ বয়সে তারা তাদের সন্তান ও নাতি নাতনির সান্নিধ্য পেতে চায়। দয়া করে তাদেরকে এই ক্ষুদ্র চাহিদা থেকে বঞ্চিত করবেন না। প্রকৃতি এমন একটা জিনিস যা আপনার কর্মফল প্রকৃতিতেই কড়ায় গন্ডায় মিটিয়ে নেয়। তাই দায়িত্ববোধ থেকে না হলেও প্রাকৃতিক শাস্তির কথা বিবেচনা করে হলেও আমরা নিজেদের মানবিকবোধকে প্রস্ফুটিত করি। মানবিক আলোয় জাগিয়ে তুলি আমাদের সমাজ। সত্য, সুন্দর ও স্বচ্ছতায় জেগে উঠুক বিবেক। সবার ঘুমিয়ে থাকা মানবিকতা এবং মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করি। দিনশেষে আমাদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য হোক পিতামাতা। এবং প্রমাণ করে দেই বার্ধক্য মানেই নয় অসহায়ত্ব। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
