কামাল লোহানী আর নেই

আপডেট : ২০ জুন ২০২০, ২২:৪০

ভাষাসৈনিক, গুণী সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক কামাল লোহানী আর নেই। গতকাল শনিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে রাজধানীর মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তিনি এক ছেলে সাগর লোহানী, দুই মেয়ে বন্যা ও ঊর্মি লোহানীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

কামাল লোহানী দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতা ছাড়াও হূদেরাগ ও ডায়াবেটিসের সমস্যাতেও ভুগছিলেন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৭ জুন সকালে তাকে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত শুক্রবার তার কোভিড-১৯ পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর তাকে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিত্সাধীন ছিলেন।

বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে সাংবাদিক হিসেবে, সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় যোদ্ধা। ষাটের দশক থেকে রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক আন্দোলন যখন এক পথে মিলে গিয়েছিল তখন থেকেই তিনি এ দুই পথেরই যোদ্ধা। এ দেশের ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সঙ্গে রয়েছে তার সম্পৃক্ততা। ১৯৬১ সালে অন্য অনেকের সঙ্গে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে তার ছিল দৃঢ় ভূমিকা। রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনে পাকিস্তানি নিষেধাজ্ঞা জারি হলে ছায়ানটের নেতৃত্বে কামাল লোহানী ও হাজারো রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মী সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ষাটের দশকের শেষ ভাগে ন্যাপের (ভাসানী) রাজনীতিতে জড়িয়ে কামাল লোহানী যোগ দেন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে বাংলার শিল্পীরা যে ভূমিকা রেখেছেন, তার সঙ্গেও কামাল লোহানী পুরোপুরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ২০১৫ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

দুপুরে তার মরদেহ রাজধানীর শেখেরটেকের কোয়ান্টম ফাউন্ডেশনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী গোসল করানো হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় অফিস প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার খান সনতলা। সেখানে জানাজা শেষে পুলিশের একটি চৌকশ দল তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। পরে বাদ এশা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্ত্রীর কবরে তাকে সমাহিত করা হয়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

কামাল লোহানীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা। শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাতীয় পার্টি-জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন প্রমুখ।

শেষ শ্রদ্ধা

দুপুরে কামাল লোহানীর মরদেহ রাজধানীর তোপখানা রোডে উদীচী কার্যালয়ে নেওয়া হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় জাতীয় শ্রমিক জোট, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিবর্তন সাংস্কৃতিক ফোরাম, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, হাতেখড়ি, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন, নবনাট্য সংঘ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সিপিবি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীসহ বিভিন্ন সংগঠন তার মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পরে উদীচীর পক্ষ থেকে সমবেত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করা হয়।

জেপির শোক

কামাল লোহানীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। বিবৃতিতে তারা বলেন, কামাল লোহানী ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, একজন সাহসী সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন কলম সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তার ইন্তেকালে দেশ একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বকে হারাল।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

কামাল লোহানীর পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। তার জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে। কামাল লোহানীর বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী, মা রোকেয়া খান লোহানী। কামাল লোহানী দৈনিক মিল্লাত পত্রিকা দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনের বছর পাশ করেন মাধ্যমিক পরীক্ষা। সে সময় থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ততা। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে তিনি প্রচলিত শিক্ষার ইতি টানেন। রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চাই এরপর তার সারাজীবনের সাধনায় রূপ নেয়।

প্রথম গ্রেফতার হন ১৯৫৩ সালে। সে সময় পাবনার তত্কালীন জিন্নাহ্ পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠানে নুরুল আমিনের আগমনের প্রতিবাদ করায় অনেকের সঙ্গে তিনিও গ্রেফতার হন। এরপর একাধিকবার তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকায় এসে যোগ দেন দৈনিক মিল্লাত অফিসে। এ বছরই তিনি ন্যাপে যোগ দেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হলে তিনি আত্মগোপনে যান।

১৯৫৮ সালে কামাল লোহানী যুক্ত হন নৃত্যশিল্পের সঙ্গে। ১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি’ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন ঢাকা বেতারের। ১৯৭৩ সালে দৈনিক জনপদ নামে একটি নতুন পত্রিকায় যোগ দিয়ে আবার ফিরে আসেন সাংবাদিকতায়। পরে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তায় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে দৈনিক বার্তা ছেড়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে যোগ দেন। পরে দুই বার তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিকতা জীবনে তিনি আজাদ, সংবাদ, বঙ্গবার্তা, বাংলার বাণী ও পূর্বদেশ পত্রিকায়ও গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন কামাল লোহানী। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।