অতুলনীয় বই উত্সব

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৩

নূতন বইয়ের মৌমাতানো ঘ্রাণে শুরু হইয়াছে নূতন শ্রেণির আনন্দযাত্রা। কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ নহে, পহেলা জানুয়ারির একই দিনে সারা দেশে বিতরণ করা হইল ৩৩ কোটি বই! প্রাক-প্রাথমিক হইতে শুরু করিয়া দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিকট বিনামূল্যে বিতরণ করা হইল এই বিপুলসংখ্যক পাঠ্যপুস্তক। এই বই উত্সবের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সাল হইতে। দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এখন বাংলাদেশে এমন কোনো গ্রাম নাই যেইখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই।

শিক্ষার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ পাঠ্যপুস্তক। ইহা একসময় টাকা দিয়াই ক্রয় করিতে হইত। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) গঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। ১৯৮১ সাল হইতে প্রতি বত্সর সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ইউনিসেফের সহায়তায় প্রথম শ্রেণি হইতে পঞ্চম শ্রেণি অবধি বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ২০১০ সাল হইতে প্রথম হইতে পঞ্চম শ্রেণির পাশাপাশি ষষ্ঠ হইতে দশম শ্রেণি অবধি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিনামূল্যে তাহা বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়। একইসঙ্গে ২০১০ সাল হইতেই প্রথম শুরু হয় বই উত্সব। কিন্তু শুরুতে ষষ্ঠ হইতে দশম শ্রেণি অবধি বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের যাত্রাপথটি খুব মসৃণ ছিল না। ২০০৯ সালের ১৮ অক্টোবর এনসিটিবির গুদামে রহস্যজনকভাবে আগুন লাগে। ইহার পর ২০১০ সালেও প্রেসে আগুন লাগে। পাঠ্যপুস্তকসহ ট্রাক খাদে পড়ে যায়, স্বার্থান্বেষী কিছু মহল আরো বিচিত্র ধরনের ষড়যন্ত্র করিতে থাকে। কিন্তু সকল ধরনের অপ্রত্যাশিত বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করিয়াই মহাজোট সরকার পহেলা জানুয়ারিতেই দেশের শিক্ষার্থীদের নিকট বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক পৌঁছাইয়া দিতে সক্ষম হয়। এই বত্সরও পহেলা জানুয়ারিতে বই উত্সব যথাযথভাবে সম্পন্ন করিবার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করা হইয়াছিল। ২০১৮ সালের আগস্টে একাধিক জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ হয় যে, ২০১৯ সালের প্রথম দিনে প্রাক-প্রাথমিক হইতে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি বই বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করিয়াছে সরকার। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার কারণে ওই বত্সর অক্টোবরের মধ্যেই সমস্ত বই ছাপা শেষ করিতে চাহিয়াছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু আগস্টের শুরু অবধি প্রাক-প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের ছাপা কাজে অগ্রগতি থাকিলেও প্রাথমিকের প্রায় ১০ কোটি পাঠ্যবই ছাপার কার্যাদেশই দিতে পারে নাই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ইহা ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান কাগজ সরবরাহে বিলম্ব করিবার কারণে মাধ্যমিকের প্রায় ৫ কোটি পাঠ্যবই যথাসময়ে ছাপা হওয়া লইয়াও সংশয় প্রকাশ করা হইয়াছিল। সব মিলাইয়া আশঙ্কা করা হইয়াছিল যে, প্রায় ১৫ কোটির বেশি বই যথাসময়ে বিতরণ করা সম্ভব হইবে না।

কিন্তু সকল আশঙ্কাকে অমূলক প্রমাণিত করিয়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার বরাবরের ন্যায় এইবারও যথাসময়ে বিপুল সমারোহে বই উত্সব সম্পন্ন করে। এমন কী নিজেদের ভাষায় বই পাইতেছে চাকমা, মারমা, সাদ্রী, গারো ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর শিশুরাও। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও রহিয়াছে ব্রেইল বই। সুতরাং এমন বই উত্সবের তুলনা বিশ্বে আর কোথাও নাই। ইহা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের বিষয়।