এই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৪

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভাব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পক্ষে ভোট সুনামিতে ঘুচে গেল। বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে তাদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট দিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও উন্নয়নের পক্ষে, তাতে বিরোধী পক্ষের রাজনীতি ভেসে যাওয়ার মতো অবস্থা। তবে এটা ভোট-সুনামির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব বিলীন হবার সম্ভাবনা তৈরি করে দিল বাংলাদেশের জনগণ। তৃতীয়বারের মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে জনগণ একটি নতুন মাত্রার উন্মেষ করলো। এবার মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা একাট্টা হয়ে গত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে হটাতে গিয়ে ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে দিল তার পক্ষে।

দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সকল নিবন্ধিত দলের অংশগ্রহণ নতুন নজির স্থাপন করেছে। নির্বাচন নিয়ে পুরাতন ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন গণতন্ত্র অনুশীলনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। পরাজিত হয়ে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান মূলত জনগণের রায়ের প্রতি অনাস্থা। এটা আগামী রাজনীতির ক্ষেত্রকে সংকীর্ণ করবে, অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করবে এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথচলা বিঘ্নিত করবে। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পরাজয়ের দায় নির্বাচনী পরিবেশের উপর চাপিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশলের ত্রুটি ও নেতৃত্বের ঘাটতি ঢেকে ফেলা খুব সহজ নয়। নেতাকর্মী ও জনগণ এখন অনেক সচেতন। সন্ত্রাস ও সহিংস রাজনীতির চর্চা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির সাথে গাঁটছড়া, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে চক্রান্তে জড়িয়ে পড়া, জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুতে অস্বচ্ছ অবস্থান এবং নেতৃত্বের দুর্বলতাকে পরাজয়ের কারণ হিসেবে না দেখে নির্বাচনী পরিবেশের উপর দায় চাপিয়ে তারা কতদূর এগুতে পারবে— তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে দেশে-বিদেশে সমানভাবে। রাজনৈতিক যুদ্ধ রাজনীতি দিয়ে করতে হবে। অন্য উপায় অবলম্বন আরো আত্মঘাতী হবে যা অতীতের গতিপ্রকৃতি থেকে অনুধাবন করতে বেগ পেতে হয় না। 

দৃশ্যমান উন্নয়নকে অস্বীকার করতে পারেনি বিশ্ব। কিন্তু উন্নয়নের বিপরীতে নির্বাচনকে অনেক খাটো করে দেখে নির্বাচন এবং আন্দোলনের দোলাচলে পড়ে সিদ্ধান্তহীনভাবে নির্বাচনী কৌশল বিনির্মাণের ব্যর্থতাকে অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে ফেলা বেশ দুষ্কর। গণরায়কে উপেক্ষা করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যথেষ্ট যুক্তি ও সাক্ষ্য হাজির করাও কঠিন।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেই তথাকথিত গণতন্ত্রের অভাব ঘুচিয়ে দিয়েছে এবারের নির্বাচন— যেখানে সব রাজনৈতিক দল এবং জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষণীয়।

ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট মানুষকে ভোট বিপ্লবের ডাক দেয়, জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যাচার করে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করার মহাকৌশল নিয়ে এগিয়ে গেলেও জনগণ তাদের ধোঁকাবাজি ধরে ফেলেছে বলে মনে হলো ভোটের ফল দেখে। পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে তারা এখন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টায় মেতে উঠেছে। নতুন নির্বাচনের দাবি মানুষের রায়ের প্রতি অনাস্থা। গণরায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধারে গণতন্ত্রবিরোধী মৌলবাদী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের নামে সহিংসতার দামামাও বাজানোর চেষ্টা চলছে।

বিরোধীদের পরাজয় ও সরকারি দলের প্রতি জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট এসেছে মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অগাধ আস্থা থেকে। ফলে উন্নয়নের মহাযাত্রাকে বেগবান করার পাশাপাশি নতুন প্রত্যাশার চাহিদাকেও যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে এ ফলাফল, তেমনি জন্ম দিয়েছে আগামী পথচলায় নতুন পর্বতসম চ্যালেঞ্জের।

আশা করি, প্রত্যাশা পূরণের জন্য আগামীদিনের সরকারের চেহারা ও চরিত্র জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবে। শুরুতেই জনগণ নিজেদের ভোটের যথাযথ মর্যাদা আশা করে। সব প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে দেশরত্ন শেখ হাসিনার স্বচ্ছ ও সত্ গুণাবলি-সংবলিত সুযোগ্য নেতৃত্বকে ঘিরে। বিরোধীদের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান এবং সরকারি দলের প্রতি একচ্ছত্র সমর্থন প্রকৃতপক্ষে চ্যালেঞ্জকে আরো কঠিন করে তুলেছে। বিজয়ী দলের মধ্যে স্বেচ্ছাচারী প্রবণতা জন্মানোর স্বাভাবিকতাকে ঠেকানো নতুন ও প্রথম দায়িত্ব। জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা প্রদর্শন যারা ভোট দিয়েছেন তাদের মাঝে সন্তুষ্টি তৈরি করবে। তাই এখন নির্বাচনী ইশতিহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি নতুন করে পড়তে হবে এবং অক্ষরে অক্ষরে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা এবং তার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মানুষ শান্তি খুঁজে পেয়েছে এবং আস্থাভরে ভোট দিয়েছে। এবার শুনেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার প্রতিশ্রুতি— যেখানে মানুষের প্রত্যাশার গভীরে বাস করছে দুর্নীতি ও নিপীড়নমুক্ত অসম্প্রদায়িক সমাজ। একদলীয় সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্যে সমাজে দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের আচরণ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এবং নিজ আধিপত্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নেমে তারা দলীয় কোন্দলে মেতে ওঠে।

সংসদে বিরোধীদের ক্ষীণ অবয়ব গণতন্ত্র অনুশীলন ও ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে তাত্ত্বিক ধারণাকে উল্টে দেবার জন্য করণীয় কৌশল বা বিকল্প পন্থা অনুসন্ধান ও চর্চা নতুন গুরুত্ব বহন করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। ভিন্ন মত প্রকাশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিভাবে বেশি কার্যকর করা যায় তার উপায় খুঁজে পেতে হবে। স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের ক্ষমতায়িত করে শূন্যতা পূরণের বিকল্প পথ হিসাবে দেখা যেতে পারে।

২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে অনেক তেলেসমাতি তত্ত্ব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ছিল ভিন্ন আমেজ। সকল দল অংশগ্রহণ করেছে, নির্ভয়ে সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। আগ্রহভরে ভোট দিয়েছেন মানুষ। ভোটের ফলাফলে বিরোধীপক্ষ নিরাশ হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী কোনো কোনো দেশও হতাশ হয়েছে। ফলে নির্বাচনপরবর্তী ভূ-রাজনীতিতে সুনামির ধাক্কা লেগেছে। চ্যালেঞ্জকে করেছে আরো বহুমুখী। শতকরা ৮০ ভাগ ভোট পড়েছে। মৌলবাদী ও যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে জনগণ সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করেছে, যেখান থেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্  পথচলা ভিন্ন হতে বাধ্য।

মুক্তিযুদ্ধের ধারায় বাংলাদেশ চলবে এবং বিকশিত হবে, এবার এই প্রত্যাশা পোক্ত হয়েছে। নতুন বা তরুণদের ভোটের গুরুত্ব বেড়েছে। তাদের প্রত্যাশাকে পড়তে হবে গভীরভাবে। তরুণরাই বদলে দিতে পারে বাংলাদেশকে। নিয়ে যেতে পারে উন্নয়নের চূড়ায়। তাদের কর্মসংস্থান এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির অবকাশ আগামীতে স্বভাবতই গুরুত্ব বহন করে। এবারের নির্বাচনের সুনামি যে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে জনমনে, গতানুগতিক পথচলা দিয়ে তা পূরণ করা যাবে না। বরঞ্চ ভোট-সুনামির বিপরীতে চিন্তার বিপ্লব ঘটিয়ে বিকশিত কর্মপন্থা ও কৌশল বানাতে হবে। দেশের পথচলায় বাধা দিতে এবার আঘাতের মাত্রা ও পরিমাণ দুটোই বাড়বে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ধরে রাখতে তাদের প্রচারণার বিষয়গুলোকে বাড়তে দেওয়া যাবে না। শঙ্কা ও সম্ভাবনাকে গভীর বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশবিরোধীরা উন্নয়নের গতিধারাকে ঠেকাতে অর্থনীতির বিকাশের গলা টিপে ধরার অপচেষ্টায় লিপ্ত হবে। দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য উপযুক্ত নিরাপত্তা কৌশল ও নিরাপত্তা সহযোগী গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বিক নিরাপত্তা কৌশল বিনির্মাণ দেশকে অযাচিত ও অদৃশ্য শক্তির ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখবে।

এবারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গণতন্ত্রের অভাব ঘোচালেও সুশাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার কাজ করে চলেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের মদদ। অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে অর্থনৈতিক কৌশলকে সম্পৃক্ত করে এগুতে হবে। আগামী দিনে রাজনৈতিক পরিম্ললে জনগণের সকল অংশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কৌশল বিনির্মাণ জরুরি হলেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে এটি অনেক বড় আকৃতির।

দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব এবং সংবিধানের বাধ্যবাধকতা অনুসরণে কোনো অসুবিধা নেই— সেটা প্রমাণ করলো এবারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ধারণা বদলাতে এই নির্বাচন অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতের নির্বাচনী ধারণা তৈরিতে এই নির্বাচন নতুন দিক খুলে দিল। তাই এই নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে অনেক অপশক্তি সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের বিপরীতে ভোট এসেছে। ফলে স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে দেওয়া ম্যান্ডেট ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোন পথে চলবে, কোন আদর্শ নিয়ে সামনে যাবে তার নির্দেশনা স্পষ্ট করেছে।

এই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। এখানে অংশ নেওয়া ভোটারদের প্রত্যাশাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনের উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দিকপাল হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা এদেশকে এগিয়ে নিয়ে নতুন মর্যাদায় স্থাপন করবেন— এই আস্থা মানুষের মনে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এদেশের মানুষ আস্থার সঙ্গে দেশরত্ন শেখ হাসিনার পক্ষে তাদের রায় একচ্ছত্রভাবে আবার প্রদান করেছেন। উন্নয়নের ধারা মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। সেই সাথে উন্নয়নের সুফলকে বৈষম্যহীনভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার পুরনো চ্যালেঞ্জ নতুন অবয়বে উঠে এসেছে। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করার কৌশলকে জনগণের কাছে শুরুতেই দৃশ্যমান করতে পারলে ভোট দেবার আনন্দ উপভোগ করবেন ভোটদানকারীরা।

নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে। সাথে জানিয়ে দিল তাদের প্রত্যশার কথা। গভীর এবং অবিস্মরণীয় অবিচল আস্থা স্থাপন করেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। অনেক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আগামী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে হবে দেশকে এবং জনগণকে। অবশেষে গণতন্ত্রের অভাব ঘুচলো। সরকারের বৈধতা নিয়ে তোলা প্রশ্নের মৃত্যু হলো। 

n লেখক :স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইন্সটিটিউট অব কনফ্লিক্ট,

ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস (আই ক্লাডস) এর নির্বাহী পরিচালক