প্রবাসী আয় প্রবাহে চাই নতুন গতি

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৪

২০১৮ সালে প্রায় ১৬০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এটি গত বছর থেকে প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন ও উন্নয়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সংস্থাটি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়াবে এক হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। ২০১৭ সালের তুলনায় এই অঙ্ক ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। বিশ্বের শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। এ তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির রেমিট্যান্স আহরণের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলার। উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি বাড়েনি। বিশেষ করে, সৌদি আরবের জাতীয়করণ নীতি এবং ভারতের সস্তায় জনশক্তি রপ্তানির কারণে দেশটিতে আমাদের জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। যে কারণে রেমিট্যান্সের বড় উত্স সৌদি আরব থেকে প্রবাহ কিছুটা কমেছে। এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়া সরকারের জনশক্তি আমদানি স্থগিত করাও বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়ার আরও একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি রয়েছে, যাদের ৮৮ শতাংশই কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়া দেশত্যাগ করেছে। অর্থাত্ প্রায় ৭৬ লাখ প্রবাসীর কাজের প্রশিক্ষণ নেই। আর বাকি ১২ শতাংশ প্রবাসী কারিগরি শিক্ষা, ভাষা, কম্পিউটার ও ড্রাইভিং—এ চারটির কোনো একটির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ ছেড়েছে। প্রবাসীদের মধ্যে চিকিত্সক, প্রকৌশলী, শিক্ষক এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ডিগ্রিধারীর সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগ প্রবাসীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে। ৬২ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত। ১৬ শতাংশের উচ্চশিক্ষা রয়েছে। দক্ষ ও শিক্ষিতের সংখ্যা কম হওয়ায় বিদেশে বাংলাদেশিরা ভালো চাকরি পায় না।

দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ যত বাড়বে আমাদের অর্থনীতি তত বেশি চাঙ্গা হবে। কিন্তু বিদেশ থেকে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতা বিদ্যমান এখনো। ব্যাংক কিংবা এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে বৈধ চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের ব্যাপারে প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া তেমন জোরদার হয়ে ওঠেনি এখনো। দায়সারা কিছু প্রচারণার মাধ্যমে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা অভিযোগ রয়েছে এক্ষেত্রে। প্রথমত আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এবং এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর রেমিট্যান্স ফি বা খরচ তুলনামূলকভাবে আঞ্চলিক ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই বেশি। সামপ্রতিক সময়ে এটা কিছুটা হ্রাস করা হয়েছে বটে তবে অনেক প্রবাসীকে তার উপার্জিত অর্থের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অর্থ দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে খরচ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে এখনো নানা দীর্ঘসূত্রতা, ঝুঁকি, বিলম্বে বেনিফিসিয়ারির রেমিট্যান্স প্রাপ্তি বিষয়গুলো দারুণ পীড়াদায়ক হয়ে আছে। ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো এ খাত থেকে বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছে এ কারণে তারা রেমিট্যান্স ফি যৌক্তিকভাবে আরও কমিয়ে আনতে পারে। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের তুলনায় বেড়ে গিয়ে তাদের আয়ের পরিমাণও অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স ফি কমিয়ে আনতে পারে। বিদেশে অনেক ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে গিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ হলে প্রবাসীরা স্বদেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে অনুত্সাহিত হন। তারা তখন অবৈধ উপায় অবলম্বন করে হুন্ডির আশ্রয় গ্রহণ করেন। যার মাধ্যমে সন্ত্রাস, অপরাধ, মাদক পাচার, চোরাচালানের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হয়ে ওঠে। প্রবাসীদের আরও বেশি পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে বিশেষ উদ্দীপনামূলক সঞ্চয়ী স্কিম চালু করা হয়েছে। যাতে উচ্চ হারের মুনাফা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যা প্রবাসী ভারতীয়দের রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশেও প্রবাসীদের অর্থ ব্যাংকে এবং সঞ্চয় ব্যুরোতে নির্দিষ্ট মেয়াদে জমা রাখার লক্ষ্যে ওয়েজ আর্নার বন্ড চালু রয়েছে। এগুলো সম্পর্কে বেশিরভাগ প্রবাসী তেমন ভালোভাবে অবহিত নন।

প্রতি বছরই অনেক প্রবাসী দেশে বিনিয়োগ করতে আসেন। কিন্তু নানা সমস্যা দেখে তারা বিনিয়োগ না করে হতাশ হয়ে ফিরে যান। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে সমানতালে বাড়ছে না রেমিট্যান্স। এর আগে তিনটি অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমার পর গত অর্থবছরে বাড়লেও ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের পর্যায়ে আসেনি। বিদেশে যে পরিমাণ কর্মসংস্থান হচ্ছে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহে তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না। ব্যাংকের চেয়ে অবৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা বেশি থাকায় সামান্য লাভের আশায় অনেকে সেদিকে ঝুঁকছেন। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানির মতো করে রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বেশি রেমিট্যান্স আসে এমন দেশে ব্যাংকের কালেকশন বুথ বাড়ানো এবং ছুটিসহ সপ্তাহের যেকোনো দিন রেমিট্যান্স পাঠানোর পর দ্রুত তা সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা, বিদেশি এজেন্সির সঙ্গে মূল ব্যাংকে নিয়মিত হিসাব সমন্বয় এবং রেমিট্যান্স আহরণে উদীয়মান ফ্রান্স, মিসর, লিবিয়া, লেবানন, মরিশাস ও গ্রিসের মতো দেশে ব্যাংকের রেমিটার এজেন্সি বাড়ানো উচিত। যদিও রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা দেওয়া সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপার, তবে রপ্তানির মতো নগদ সহায়তা দেওয়া সমীচীন হবে না। কেননা এমন হলে একশ্রেণির দুষ্টুচক্র উল্টো দেশ থেকে হুন্ডি করে ডলার বাইরে নিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে আবার দেশে এনে প্রণোদনা নেবে। তবে প্রবাসীদের অর্থ বৈধ চ্যানেলে দেশে আনতে বন্ডে বিনিয়োগে সর্বোচ্চ সুদ এবং দ্রুততম সময়ে সুবিধাভোগীর টাকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে।

n লেখক :ব্যাংকার