বাংলাদেশের উপকূলবর্তী মানুষের দুঃখদুর্দশার অন্ত নাই। প্রায়শ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক তাহাদের লাগিয়াই থাকে। দুর্যোগ মোকাবিলায় তাহাদের শক্তি ও সাহসের কথা বিশ্ববাসী জানে না, এমনটি নহে; কিন্তু কিছু কিছু দুর্ভোগ তাহারা সারা বত্সর ধরিয়াই পোহাইয়া থাকে, যেইখান হইতে তাহাদের সহসা পরিত্রাণ মিলিতেছে না। এমন একটি সমস্যা হইল উপকূলবর্তী এলাকার কৃষিজমিতে চাষাবাদের সংকট। কেননা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন কারণে সাগরের লোনাপানি আসিয়া কৃষিজমিকে চাষাবাদের অনুপযোগী করিয়া তোলে। বলা হইয়া থাকে যে, উপকূলবাসীর দুঃখ লোনাপানি। তাহারা ঝড়ঝাপটা তাত্ক্ষণিকভাবে মোকাবিলা করিতে পারে; কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার নিকট তাহারা বলিতে গেলে অনেকটাই অসহায়। উপকূলবর্তী ১৬টি জেলার কৃষিজমি বত্সরের অধিকাংশ সময়ই প্লাবিত থাকে লোনাপানিতে। ইহাতে জমির চাষযোগ্যতা ও উর্বরতা কমিয়া যায়। ইদানীং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন ঘটনা অধিক ঘটিতেছে। বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়া গিয়াছে। ইহাতে একদিকে ঘূর্ণিঝড় বাড়িয়া গিয়াছে, অন্যদিকে অধিক পরিমাণ কৃষিজমি লোনাপানিতে নিমজ্জিত হইতেছে। এই লোনাপানির কারণে এই সকল এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিতেছে। এই জন্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রহিয়াছে। তবে এই এলাকার মানুষের জীবিকার জন্য চাষযোগ্য কৃষিজমি রক্ষার কথাও এখন অধিক করিয়া ভাবিতে হইবে।
মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮ লক্ষ ৬০ হাজার হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে অন্তত সাড়ে ১০ লক্ষ হেক্টর লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত। শুধু খুলনায় ২ লক্ষ ১৩ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ১ লক্ষ ৯০ হাজার হেক্টর যাহা মোট আবাদযোগ্য জমির ৮৯ শতাংশ। অর্থাত্ খুলনায় এই অবস্থা তুলনামূলকভাবে নাজুক। অধিকাংশ এলাকার জমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ এতই বেশি যে, সেখানে লবণসহিষ্ণু কৃষি উত্পাদনে জাতের সাফল্যও পাওয়া যাইতেছে না। সাধারণত লবণাক্ততার পিপিটি মাত্রা তিনের উপরে উঠিলে সেই জমি চাষের যোগ্যতা হারাইতে থাকে। আর আট পিপিটি অতিক্রম করিলে লবণসহিষ্ণু জাতেও ফলন হয় না। এই কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোও (বিবিএস) বলিতেছে—শস্য-নিবিড়তায় পিছাইয়া পড়িতেছে খুলনা। সার্বিকভাবে দেশে ফসল-নিবিড়তা প্রায় ২০০ শতাংশ হইলেও এই অঞ্চলে তাহা ১৩০-এর ঘরে।
উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩২ শতাংশ ভূমিতে বসবাস করিতেছে প্রায় ৪ কোটি মানুষ। তাহাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় স্থায়ী ও শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করিতে হইবে, যাহাতে তাহাদের জমিজমা লবণাক্ততা হইতে রক্ষা পায়। এই অঞ্চলের ৫৩ শতাংশই জমি লবণাক্ত এবং চাষযোগ্য ৩০ শতাংশ জমি আবার পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যায় না। এই জন্য আবাদ হুমকিতে থাকা এই সকল জমি চাষের আওতায় আনিবার চেষ্টা করিতে হইবে। শুধু লবণসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন করিলেই চলিবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটির গবেষকরা বিদ্যুতের শক দিয়া পানি হইতে লবণ আলাদা করিবার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করিয়াছেন। সয়েল টেস্টের মাধ্যমেও পরিকল্পিতভাবে লবণসহিষ্ণু কৃষির সম্প্রসারণ করা যাইতে পারে। নেদারল্যান্ডভিত্তিক সল্ট ফার্ম ফাউন্ডেশন এইরূপ মাটিতে বিশেষ পদ্ধতিতে গাজর, বাঁধাকপি, ওলকপি ও আলু উত্পাদন করিয়া ভালো ফল পাইয়াছে। উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের দুঃখ দূর করিতে হইলে এই সকল উদ্ভাবনার প্রয়োগ লইয়াও চিন্তাভাবনা করিতে হইবে।
