তালেব রানা
শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের লেখা একটি বই। যদিও এর প্রকাশ আটকে দেওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বইটি প্রকাশের অনুমোদন দিয়েছেন আদালত। তবে ওয়াশিংটন ডিসিতে আমেরিকার ডিস্ট্রিক্ট আদালতের বিচারক রয়েস ল্যামবার্থ বলেছেন, জন বোল্টন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে একটা ‘জুয়া খেলেছেন’এবং ‘দেশকে ক্ষতির মুখে ফেলেছেন’। দ্য রুম হোয়্যার ইট হ্যাপেন্ড (যে ঘরে এসব ঘটেছে) শীর্ষক বইটি আগামীকাল বাজারে বেরোচ্ছে।
এই বইতে বোল্টন ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষ করে ট্রাম্পের এমন সব তথ্য প্রকাশ করেছেন যা রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বইটিতে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তুলে ধরেছেন একজন অজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে, যার সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে জ্ঞানের অভাব রয়েছে এবং যিনি বেশির ভাগ সিদ্ধান্তই নেন আগামী নির্বাচনে আবার জিতে আসার উদ্দেশ্যেই। যার কাছে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে পরিবারের ভালোর বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ১৭ মাস জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকার কারণে বোল্টন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও সিদ্ধান্তগুলো অনেক কাছ থেকে দেখেছেন। তার প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার বইতে এ বিষয়গুলোই বেশি উঠে এসেছে। ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কাজে প্রশাসনের অনেকেই তার পেছনে হাসাহাসি করেছেন বলে লিখেছেন তিনি।
বইতে বোল্টন লিখেছেন, বিশ্বের স্বৈরশাসকদের পক্ষেই অবস্থান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। দ্বিতীয়বারের মতো জয়ী হতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। নিজেই উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েছেন। ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০১৮ সালে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমেরিকায় যখন তদন্ত চলে, তখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ানকে তিনি সাহায্য করার প্রস্তাব দেন। তার এসব পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অনেকটাই সাংঘর্ষিক।
মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দীর্ঘদিনের। অথচ ট্রাম্প বলেছেন, শিনজিয়াং এলাকায় মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের বন্দিশিবিরে আটকে রাখার চীনা সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকায় তিনি চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেও রাজি ছিলেন না।
বিশ্বে মার্কিন আধিপত্য ধরে রাখতে মিত্রশক্তির বিষয়টি অতীতে যেভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা গুরুত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেখানে উলটো পথে হেঁটেছেন। ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়াকে হুমকি মনে করে। এ কারণে রাশিয়ার সামরিক শক্তির বিস্তার ঠেকাতে ও মিত্রদের রক্ষায় আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সবসময়ই তত্পরতা দেখিয়েছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার প্রতি নরম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এসেছেন। বোল্টন তার বইতে লিখেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ কখনোই পছন্দ করেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। বোল্টন মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট যাকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চাইলেই বেহালার মতো বাজাতে পারেন।
বোল্টন বইতে লিখেছেন, ২০১৮ সালে ন্যাটোর এক শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেন যে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাবে। তিনি বলেন, যারা অর্থ দেয় না তাদের পক্ষে আমরা থাকব না। দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ সম্পর্কেও ট্রাম্পের জানাশোনা অনেক কম। ট্রাম্প জানতেন না যে যুক্তরাজ্য পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। ২০১৮ সালে ব্রিটেনের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সঙ্গে এক বৈঠকে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিটেনকে পরমাণু শক্তিধর দেশ বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প উত্তর দেন, ওহ, আপনার দেশে পরমাণু অস্ত্র আছে বুঝি? বোল্টন লিখছেন, তিনি মজা করে একথা বলেননি।
এই বইয়ে মি. বোল্টন যেসব দাবি করেছেন তার বেশিরভাগেরই ভিত্তি ব্যক্তিগত কথাবার্তা এবং ফলে সেগুলো যাচাই করা অসম্ভব। ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে বোল্টনের এসব দাবি নস্যাত্ করার চেষ্টা করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, এই বই মিথ্যা কাহিনি এবং আষাঢ়ে গল্পে ভরা। তবে বিশ্লেকরা বলছেন, এই বইয়ে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তাতে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও অবস্থান নিয়ে এক ধরনের অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা তৈরি হবে। মিত্ররা নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে শুরু করবে। অনেক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে তাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চাইবে। এমন হলে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্ষুণ্ন হবে।
