স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে চিহ্নিত হয়নি বধ্যভূমি ও শহীদদের গণকবর, এমনকি নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতি ফলক। অথচ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর সঙ্গে দেশের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছিল মির্জাপুরে। ১৯৭১ সালের ৭ মে গণহত্যা, ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত এবং ৩ এপ্রিল দেশের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন মির্জাপুরের গোড়ান-সাটিয়াচড়া নামক স্থানে। দীর্ঘ ৮ মাস ১০ দিন যুদ্ধের পর দামাল ছেলেরা পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে মির্জাপুরকে মুক্ত করে।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস জানান, মির্জাপুর উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৮৯২ জন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ১১ নং সেক্টরের অধীনে এখানে যুদ্ধ হয়। মরহুম আজাদ কামাল বীর বিক্রমসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে টাঙ্গাইলে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। ৩ এপ্রিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান-সাটিয়াচড়ায় পাকসেনারা আসামাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা নরঘাতকদের ওপর গুলি চালায়। এই সম্মুখযুদ্ধে ১০৭ জন মুক্তিপাগল বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং ইপিআর নিহত হয় ২৩ জন। ৩৫০ জন পাকবাহিনী হতাহতের পর গোড়ান-সাটিয়াচড়া মুক্ত হলেও পাকসেনারা ঘাঁটি করে বসে মির্জাপুর উপজেলা সদর, মির্জাপুর সাহাপাড়া, বাংগলা, তরফপুর, ভড়রা ও নরদানা গ্রামে। পাকসেনারা আশেপাশের গ্রামে লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ করে নিরীহ শতাধিক বাঙালিকে হত্যা করে। ৭ মে দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা, তার একমাত্র ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা এবং ৮ মে থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল হোসেনের বৃদ্ধ বাবা জয়নাল সরকার ও মাজম আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১২ ডিসেম্বর রাতে দেশমাতৃকার সূর্য-সন্তান বীরযোদ্ধারা মির্জাপুরের বংশাই, লৌহজং নদীর দুই পাশ ও চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল সম্মুখযুদ্ধ। ১৩ ডিসেম্বর মুক্ত হয় মির্জাপুর।
১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল স্বাধীনতার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ স্মৃতি সংসদ গোড়ান, ৭ মে গণহত্যা ও ১৩ ডিসেম্বর মির্জাপুরে মুক্ত দিবসের স্থানে দীর্ঘ ৪৭ বছরেও বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও গণকবরের স্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়নি স্মৃতিফলক।
৩ এপ্রিল স্মরণে প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে গোড়ান, সাটিয়াচুড়া ও পাকুল্যা গ্রামবাসী এবং মির্জাপুর গ্রামবাসী ৭ মে ও ১৩ ডিসেম্বর উপলক্ষে আলোচনা সভা পালন করে আসছে। গোড়ান-সাটিয়াচড়া স্মৃতি সংসদের সভাপতি গোলাম সওজব পাওয়ার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক এস এম মোজাহিদুল ইসলাম মনির এবং মির্জাপুর গ্রামবাসীর পক্ষে অতুল চন্দ্র পোদ্দার মির্জাপুরের গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা একাব্বর হোসেন এবং মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক জানিয়েছেন, গোড়ান-সাটিয়াচড়া এবং মির্জাপুর পুরাতন বাস স্টেশন সংলগ্ন দুটি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ইতোমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্থান পরিদর্শন ও গণকবরগুলোর স্থান সংরক্ষণ করে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণসহ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে।
