বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসা খাতে ৫ লাখের অধিক বিদেশি কর্মী কাজ করছে। এর মধ্যে ৪ লাখের মতো রয়েছে অবৈধ। অর্থাত্ তারা অবৈধ পথে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। এছাড়া অনেকে এক বছরের জন্য কাজ করার অনুমতি নিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবছর এসব বিদেশি কর্মী বাংলাদেশ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) নিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির কোনো কোনো খাতে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হলেও এমন কিছু খাত আছে যেগুলো দেশীয় কর্মী দিয়ে চালানো যায়। কিন্তু এসব খাতেও বিদেশি কর্মীদের দাপট থাকায় দেশীয় কর্মীদের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
চাকরির বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে সেসব খাতে বিদেশি দক্ষ কর্মীর দরকার পড়ে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এসব কর্মীকে অনুমোদন দেওয়া হয়। দেশীয় কর্মীরা পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করলে বিদেশিদের চলে যাবার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে তারা যায় না। ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব সময়েও এসব বিদেশি কর্মী এখানে অবস্থান করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই দেশীয় চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। এরপর চলমান করোনা দুর্যোগকালীন সময়ে অবৈধ বিদেশি কর্মীদের বিদায় এবং অপ্রয়োজনীয় বিদেশি কর্মী বাদ না দিলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের যেসব খাতে বিদেশি কর্মীরা কাজ করে সেগুলো হচ্ছে : টেক্সটাইল, গার্মেন্টস খাত, হোটেল, রেস্টুরেন্টসহ সেবাখাত, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, বিপণন উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন দেশের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সাধারণত নতুন ধরনের ব্যবসা চালু করতে গেলে তারা বিদেশি বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়ে থাকেন। অর্থনীতিতে এমন কিছু খাত রয়েছে যেগুলোতে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন নেই। কিন্তু এসব খাতের উদ্যোক্তারা অজানা কারণে বিদেশি কর্মীদের দিয়ে অফিস পরিচালনা করেন। বিশেষ করে শিপিং লাইন, ডিস্ট্রিবিউশন, ট্রাভেল এজেন্সি এবং সাধারণ ট্রেডিং বা পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন বিদেশি কর্মীর প্রয়োজনই নেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যে কোনো বিদেশি কর্মী কাজ করতে চাইলে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) থেকে তাদের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি, আধা-সরকারি এবং সরকারি ক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। এসব কর্মীকে বেতন দেওয়া হয় মার্কিন ডলারে। অবৈধভাবে কাজ করার ফলে এসব কর্মীর বেতন থেকে প্রাপ্য করও পাচ্ছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ ধরনের বিষয়টি হাইকোর্টের দৃষ্টিগোচর করা হলে একটি রুলনিশি জারি করা হয়। ঐ রুলে বিচারক এনায়েতুর রহিম এবং বিচারক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বিডা, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্তৃপক্ষ এবং এনজিওবিষয়ক ব্যুরোকে বাংলাদেশে কত বিদেশি কর্মী কাজ করছে তার হিসেব জমা দিতে বলেন। বিডা তাদের রিপোর্টে জানিয়েছিল যে, মাত্র ১ লাখ কর্মীকে তারা বাংলাদেশে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে।
এদিকে গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশ কিছু বিদেশি কর্মী বাংলাদেশে ১০ বছরের বেশি কাজ করছে। কেউ কেউ আবার ২০ বছর ধরেও আছেন। এরা হলেন—কেডিএস লজিস্টিক্সে মিলানথা ওয়াকওয়েনা, ম্যাক এবিসি সাপ্লাই চেনের মো. ইমরান হোসাইন, এইচটিএর লজিস্টিক্সের দিলহানি আলবার্ট, এক্সপো ফ্রেইট লিমিটেডের জান ব্রুগেল ভ্যান ডার পুরটিন, ডিএসভি এয়ার অ্যান্ড সি-এর ধানুসা গুনবর্ধনে, ডিবি সেনকার বাংলাদেশের চেস্টার হাডসন, ক্রস ফ্রেইট লাইনের মিলান সামাথ প্রমুখ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিদেশি কর্মীরা যাতে দীর্ঘদিন এসব কোম্পানিতে না থাকে সে ব্যাপারে আমরা সচেতন আছি। কিন্তু কোনো কোনো কোম্পানি তাদের রাখতে খুব তত্পর। এক্ষেত্রে তারা যুক্তি দেয় যে, বিদেশি কর্মী ছাড়া তাদের চলবেই না। এ কারণে অনেক সময় আমরা অনুমোদন দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, সম্প্রতি বিদেশি কর্মী রাখা কিংবা তাদের কাজের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন বিদেশে রয়েছেন তাদের থাকার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো যুক্তি নেই বলে তিনি জানান। সিরাজুল ইসলাম বলেন, অনেকে বলে থাকেন বাংলাদেশে ১ লাখের মতো বিদেশি কর্মী রয়েছে। এ ধারণা ভুল। প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ হাজার হবে।
