চতুর্দিকে আনারস ও কলাবাগান। মাঝখানে গ্রাম মাগন্তিনগর। যেদিকে তাকানো যায় শুধুই মাটির ঘর। এ ঘরের সাথে মিল রেখে হাস-মুরগীর মাটির খোঁয়াড়। কোন কোন বাড়িতে গোয়াল ঘর। এসব মাটির ঘর, খোঁয়াড় ও গোশালা হচ্ছে স্যান্ডফ্লাই বা বেলে মাছির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আর এসব বেলে মাছি যে রোগ ছড়ায় তার নাম কালাজ্বর।
মাগন্তিনগর টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার একটি পাহাড়ি গ্রাম। শুধু মাগন্তিনগর নয়, আশপাশের জাঙ্গালিয়া, বেড়িবাইদ, ভুটিয়া, রাণীয়াত, জটাবাড়ী, পালবাড়ীসহ মধুপুরের দশ গ্রামে কালাজ্বরের প্রকোপ দেখা যায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৩০ সালের ময়মনসিংহ ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে মাগন্তিনগরে কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়ার তথ্য রয়েছে। বলা হয় সেসময়ে কালাজ্বরের মহামারির দরুন বহু মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। তখন কালাজ্বরের কোন চিকিৎসা ছিলনা। তাই মানুষের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়। এজন্য দশকের পর দশক ধরে মাগন্তিনগরকে বলা হয় কালাজ্বরের গ্রাম।
১৯৩০ থেকে ২০২০। কেটে গেছে ৯০ বছর। ব্রিটিশ গেছে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর চলছে। কিন্তু মাগন্তিনগর থেকে কালাজ্বর নির্মূল হয়নি। এখনো সেই গ্রামে কালাজ্বরের ভীতি ও প্রকোপ রয়ে গেছে।
এই গ্রামের আব্দুস সামাদ জানায়, গ্রামের মানুষ এখনো কালাজ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। এটি যেন গ্রামবাসীর নিয়তি।
টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন অফিস জানায়, গড় এলাকার ফুলবাড়িয়া, ভালুকা, মুক্তাগাছা (অংশবিশেষ) ঘাটাইল, ও সখিপুর উপজেলায় নতুন করে কালাজ্বরের রোগী মিলছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও যথাযথ চিকিৎসার জন্য এক দশক আগে ময়মনসিংহের মহারাজা সূর্যকান্ত (এসকে) হাসপাতালে কালাজ্বর গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এখানে বিনামূল্যে কালাজ্বরের চিকিৎসা ও দেয়া হচ্ছে।
জাতীয় কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচী, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী সূত্রে জানানো হয়, বর্তমানে এ রোগ ময়মনসিংহের ত্রিশাল, গফরগাঁও এবং টাঙ্গাইলের কালিহাাতী ও নাগরপুর উপজেলায়ও বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় ও রোগী মিলছে। এ জন্য বৃহত্তর ময়মনসিংহের ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কালাজ্বর পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালে বৃহত্তর ময়মনসিংহে ১৩৬ জন কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ২০১৮ সালে ছিল ১৪৫ জন। কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি হট লাইন করা হয়েছে। ০১৭৮৭৭৬৯১৩৭২ নাম্বারে কল করে যে কেউ কালাজ্বরের চিকিৎসার পরামর্শ নিতে পারেন।
কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণের ওই ইউনিট আরো জানায়, সাধারণভাবে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এ প্রাচীন রোগ নির্মূলের জন্য ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জাতীয় কালাজ্বর রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী গ্রহণ করে। ২০১২ সালে প্রথম পর্যায়ের কর্মসূচী শেষ হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফা কর্মসূচী শুরু ও শেষ হয় ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত। বর্তমানে তৃতীয় দফা কর্মসূচী চলছে। এটি শেষ হবে ২০২২ সালে। তখন সমগ্র বাংলাদেশ থেকে কালাজ্বর নির্মূল হবে বলে আশা করছেন তারা। এ জন্য আক্রান্ত এলাকায় পর্যায়ক্রমে ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে। কোন বাড়ি আক্রান্ত হলে আশপাশের আরো ৪০/৫০টি বাড়িতে ওষুধ ছিটানো হয়। কিন্তু একশ্রেণীর মানুষ সচেতন না হওয়ায় কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তারা।
মধুপুর উপজেলা হাসপাতালের সংক্রামক ব্যাধি নিরাময় চিকিৎসক ডাক্তার মইন খন্দকার জানান, মাটির ঘর, খোঁয়াড়, গোশালা থেকে বেলে মাছির মাধ্যমে ছড়ায় এই রোগ। কালাজ্বর কিছু নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্তরা জটিল সমস্যায় না ভুগলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন না।
মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার রুবিনা ইয়াসমিন জানান, উপজেলা হাসপাতালেই কালাজ্বরের পরীক্ষা হয়। পর্যাপ্ত ওষুধ ও দেয়া হয়। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন কমছে।
টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডাক্তার ওয়াহিদুজ্জামান জানান, টাঙ্গাইলের ৬ উপজেলায় কালাজ্বর রয়েছে।
জাতীয় কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচীর পর্যবেক্ষণকারী দলের সদস্য ডাক্তার মাহবুব জানান, কালাজ্বরের লক্ষণ হচ্ছে, দুই সপ্তাহের বেশি জ্বর থাকে। প্লীহা বড় হয়ে ফুলে যায়। ওজন কমে যায় এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। ২০০৮ থেকে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও জামালপুরসহ দেশের ২৬ জেলায় কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে ডেল্টা মেথ্রিন জাতীয় কেমিক্যাল বাড়িঘরে স্প্রে করা হচ্ছে। ২০২২ সালের মধ্যে দেশ সম্পূর্ণভাবে কালাজ্বর মুক্ত হবে বলে দাবি করেন তিনি।
ইত্তেফাক/আরএ
