জাপায় তিন মত

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৪৪

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে ২২টি আসন পাওয়া জাতীয় পার্টিতে (জাপা) নিজেদের অবস্থান নির্ণয় নিয়ে তিন ধরনের মত দেখা দিয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের যৌথসভায় তিন ধরনের মত উঠে আসে। বৈঠকে থাকা নেতাদের কেউ মত দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হিসেবে জাপার উচিত শুধু সরকারে থাকা। কারো মত, দশম সংসদের মতো দেশের ভেতরে-বাইরে বিতর্ক এড়াতে জাপার উচিত হবে শুধু প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নেওয়া। আবার কেউ কেউ বলেছেন, নিজ এলাকায় উন্নয়ন ও দলের নেতা-কর্মীদের স্বার্থ বিবেচনা করে জাপার উচিত হবে প্রধান বিরোধী দলে বসার পাশাপাশি বর্তমানের মতো সরকারের মন্ত্রিসভায়ও থাকা।

এছাড়া প্রধান বিরোধী দলে বসলে বিরোধী দলীয় নেতা কে হবেন তা নিয়েও জাপায় বিভক্ত মত রয়েছে। এমপিদের বেশিরভাগ আবারো রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করার পক্ষে থাকলেও কেউ কেউ এরশাদকে এবার এই পদে দেখতে চান। আবার এরশাদ ইতোমধ্যেই তার সহোদর জিএম কাদেরকে এবার বিরোধী দলীয় নেতা করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন দলের নেতাদের কাছে। গতকালের সভা শেষে জাপার কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, এই তিন ধরনের মতের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোনটি চূড়ান্ত হবে, সে সিদ্ধান্ত  নেওয়া হবে আজ বৃহস্পতিবার দলীয় এমপিদের শপথ গ্রহণের পর সংসদ ভবনে অনুষ্ঠেয় দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে। জাপা সরকারে না বিরোধী দলে থাকবে, তা সংসদীয় দল ও মহাজোটের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর চূড়ান্ত করা হবে। এমনকি জাতীয় সরকারও হতে পারে বলে মন্তব্য করেন জি এম কাদের।

জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ অসুস্থতার কারণে এই যৌথসভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। সিঙ্গাপুর থেকে চিকিত্সা নিয়ে গত ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরলেও এরশাদ শারীরিকভাবে এখনো দুর্বল। একা একা তার উঠতে-বসতে ও হাঁটাচলায় সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া তার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণও ওঠানামা করছে। এরশাদ এবারো রংপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অসুস্থতার মধ্যেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে এবং শপথ শেষে দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে যোগ দিতে এরশাদ আজ সংসদ ভবনে যেতে পারেন বলে জানা গেছে। 

এরশাদের অনুপস্থিতিতে গতকালের যৌথসভায় সভাপতিত্ব করেন জাপার কো-চেয়ারম্যান ও এরশাদ ঘোষিত দলের ভবিষ্যত্ চেয়ারম্যান জিএম কাদের। বৈঠকে নবনির্বাচিত ১৪ জন এমপি ও প্রেসিডিয়ামসহ মোট ৩৬ জন উপস্থিত ছিলেন। তবে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, সাবেক দুই মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ প্রেসিডিয়ামের অনেক সদস্য বৈঠকে যাননি।

যৌথসভা শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এরশাদের রাজনৈতিক উত্তরসূরি জি এম কাদের বলেন, আমরা দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেছি। আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের সঙ্গে মহাজোট গঠন করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আজকের সভার সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা বৃহস্পতিবার (আজ) শপথ নেবেন। শপথ গ্রহণের পর সংসদীয় দল সিদ্ধান্ত নেবে আগামীদিনে আমাদের রাজনীতিটা কোনদিকে প্রবাহিত হবে। দলের এমপিরাই বসে সিদ্ধান্ত নেবেন। এরপর মহাজোটের সঙ্গে বসেও আমাদের সমস্যা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করব।

তিনি বলেন, সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন এবং সরকার ও বিরোধী দলে থাকা না-থাকার বিষয় সম্পর্কে সংসদীয় দল সিদ্ধান্ত নেবে। দলের অধিকাংশ প্রেসিডিয়াম সদস্য এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। প্রেসিডিয়াম সদস্যরাও সংসদীয় দলকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে জি এম কাদের বলেন, সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা দরকার। তবে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যদি মনে করা হয় শক্তিশালী বিরোধী দল হচ্ছে না, যেটা আগেও হয়েছে, ’৭৩ সালে আওয়ামী লীগের সিট সংখ্যা দুই-তিনটি বাদে সবগুলোই ছিল, এটা তো জনগণের ইচ্ছা, গণতন্ত্রে তো জনগণের ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছু হওয়ার উপায় নেই। এসব বিবেচনায় এবার হয়তো জাতীয় সরকারও হতে পারে। অনেক কিছুই হতে পারে। নির্বাচনে রেজাল্ট যেটা আসে সেটার ওপর ভিত্তি করে সংসদ চলবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে জাপার কো-চেয়ারম্যান বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংসদে আওয়ামী লীগের পরই এখন আমাদের অবস্থান। আমরা মহাজোট গঠন করে নির্বাচন করেছি। জোটের সব নেতাকর্মী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। কাজেই আমরা এককভাবেই থাকতে চাই। মন্ত্রিপরিষদে থাকার বিষয়টিও সংসদীয় দল ও মহাজোটের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। জাপা চেয়ারম্যানের বিরোধী দলের নেতা হওয়ার বিষয়টিও আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। এখন আমি সম্ভাবনার বিষয়টি বলতে চাই না। সব ধরনের সম্ভাবনাই আছে। সংবাদ ব্রিফিংয়ে জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, শপথের পর পার্লামেন্টারি পার্টি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবে জাপা সংসদে কী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

ঢাকা-১ আসনে শেষ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমর্থন পাওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমা ইসলামও জাপার গতকালের যৌথসভায় যোগ দেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে তিনি বলেন, গত ১০ বছরে এই পার্টির জন্য আমি অনেক শ্রম দিয়েছি, কিন্তু দল আমার জন্য অবস্থান নিলে আমি এমপি হতাম। আমি মনে করি আমাদের সত্যিকারের বিরোধী দল হওয়া উচিত। ঢাকা-৪ আসনে আবারও এমপি নির্বাচিত জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, শেখ হাসিনা আর এরশাদের নেতৃত্বে মহাজোট হয়েছে। মহাজোটের কারণেই আমরা আজ এমপি। শেখ হাসিনা এখন রাজনীতি করেন ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের নিয়ে রাজনীতি করার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমরা সরকারে না থাকলে এলাকার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না।

বৈঠকে যোগ দেওয়া কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈঠকে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আজম খান বলেন-  মহাজোট যেহেতু সরকারই সৃষ্টি করেছে তাই মহাজোটের মাধ্যমে জাপার শুধু সরকারে থাকাই বাঞ্ছনীয়। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু বলেন, গত কয়েক বছরে পার্টির জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেছি, কিন্তু মহাজোটের মনোনয়ন পাইনি। এ পার্টি করবো কিনা এরশাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিব। তবে আমি মনে করি আমাদের গতবারের মতো এবারও মন্ত্রিসভায়ও থাকা উচিত। তা নাহলে আমরা টিকতে পারব না। প্রেসিডিয়াম সদস্য এ.টি.ইউ তাজ রহমান বলেন, আমরা হয় সরকারে থাকবো, নইলে বিরোধীদলে। বিরোধীদলে থেকে মন্ত্রিত্ব নেওয়া ঠিক হবে না। তার এ বক্তব্য সমর্থন করেন প্রেসিডিয়ামের আরেক সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম। তবে মুজিবুল হক চুন্নু, আদেলুর রহমান, পনিরউদ্দিন আহমেদসহ বেশ ক’জন এমপি বিরোধীদলের পাশাপাশি সরকারেও থাকার পক্ষে বক্তব্য দেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু নির্বাচনের আগে মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি করার দাবি জানান। সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, এসএম ফয়সল চিশতী, লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।