বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ গত সোমবার এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সমগ্রদেশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করিয়া কিছু দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখিয়াছেন। তিনি এই সময় বলিয়াছেন যে, দুর্নীতি করিয়া বড়োলোক হইতে হইলে পুলিশের চাকুরি ছাড়িয়া দিতে হইবে। পুলিশে থাকিয়া কোনোভাবেই দুর্নীতির সহিত যুক্ত থাকা যাইবে না। দুর্নীতির সহিত যুক্ত হইয়া কেহ যদি বড়োলোক হইতে চাহেন, তাহা হইলে তাহার চাকুরি ছাড়িয়া ব্যবসা করা উচিত। সেই ক্ষেত্রে তাহাকে সাধুবাদ জানানো যাইতে পারে।
নূতন আইজিপি দুর্নীতি সম্পর্কে যেই সকল কথাবার্তা বলিয়াছেন তাহা লইয়া গভীরভাবে চিন্তাভাবনার অবকাশ আছে। তিনি আসলে গাছের গোড়ায় বলিলেও ভুল হইবে, আসলে গাছের শিকড়ে হাত দিয়াছেন। এই কথা বলিয়া তিনি আমাদের সমাজের বৃহত্তর একটি চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন। কথায় বলা হয়—সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা। দুর্নীতি আসলে কোথায় নাই, আরো স্পষ্ট করিয়া বলিলে পৃথিবীর কোন দেশে নাই তাহা বলাটাই কঠিন। তিনি পুলিশপ্রধান হইয়াও তাহার বাহিনীর লোকদের সম্পর্কে প্রকৃত বাস্তবতা তুলিয়া ধরিয়াছেন। পুলিশের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সরব হইয়াছেন। এই বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল; কিন্তু ইহার পশ্চাতেও রহিয়াছে আরেক নির্মম বাস্তবতা। একশ্রেণির পুলিশ দুর্নীতি করিয়া থাকে—কোনো সন্দেহ নাই, তবে বিভিন্ন থানা এলাকায় একশ্রেণির প্রভাবশালী নেতা বিশেষ করিয়া ক্ষমতাবানদের সহিত দহরম-মহরম সম্পর্ক রাখিয়াই তাহাদের ইহা করিতে হয়। এখন এমন অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে যে, সেই প্রভাবশালীদের চাপে পুলিশের সত্ থাকাও কঠিন। দশচক্রে ভগবান ভূতের ন্যায় ভালো লোকটিও আর ভালো থাকিতে পারেন না। বাড়ির স্টাফদের সহিত তাহারা যেমন ব্যবহার করেন, অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের সহিতও তাহারা একই আচরণ করেন বলিয়া অভিযোগ আছে। গালিগালাজ হইতে শুরু করিয়া হাত তুলিতেও উদ্যত হন। অথচ তাহারা ভুলিয়া যান, পুলিশ সদস্যরা আসলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাহারা কাহারও ভৃত্য নহেন। কথা না শুনিলে হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়। তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকিলে যেইখানে তদন্ত করা দরকার, সেখানে তাহা না করিয়া উলটা তাহাদের বদলি করিয়া দেওয়া হয়।
আইজিপি ইঙ্গিত দিয়াছেন যে, যদি টাকা বানাইতে চান, তাহা হইলে অন্য জায়গা আছে। অর্থাত্ তিনি তাহার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। যেহেতু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছুদিন আমেরিকায়ও পড়াশুনা করিয়াছেন, তাই তিনি সাহসের সহিত এই সকল কথা বলিতে পারিয়াছেন। তিনি জানেন আসলে দুর্নীতির উত্স ও শেষ কোথায়। তিনি এই সকল কথা বলিয়াছেন বিবেকের তাড়নায়। উন্নয়নশীল বিশ্বে পুলিশ বাহিনীর জন্য যেই সকল সুযোগ-সুবিধা রহিয়াছে, তাহা অপ্রতুল। এই সকল সুবিধা ব্যবহার করিয়া আর যাহাই হউক বড়োলোক হওয়া যায় না। রাতারাতি বড়োলোক বা কোটিপতি হইতে হইলে শেয়ারবাজার লুট করিতে হইবে। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা মারিয়া পাচার করিতে হইবে। প্রভাবশালী বা দুষ্কৃতকারীদের মতো আচরণ করা যেহেতু সম্ভব নহে, তাই পুলিশের সত্ থাকাই বাঞ্ছনীয়। জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই রাষ্ট্রের সিভিল ফোর্স হিসাবে পুলিশের জন্ম হইয়াছে। ১৮২৯ সালে ব্রিটেনে মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট প্রণয়নের পর তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট পিলের মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম পেশাদার পুলিশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। পুলিশ শব্দের অক্ষরগুলি বিশ্লেষণ করিলে ইহার অর্থ দাঁড়ায় তাহারা হইবেন ভদ্র (পোলাইট), অনুগত (অবিডিয়েন্ট), বিশ্বস্ত (লয়াল), বুদ্ধিমান (ইনটেলিজেন্ট), সাহসী (কারেজিয়াস) ও দক্ষ (ইফিসিয়েন্ট)। এই সকল গুণ লইয়া বাংলাদেশের মতো সমাজে পুলিশের বড়োলোক হওয়া কি সম্ভব?
