টিআর-কাবিটার অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হউক

আপডেট : ২৩ জুন ২০২০, ২১:৪৪

 ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পটি স্কুলে পাঠ্যভুক্ত হইবার কারণে ইহার সারমর্ম অনেকেরই জানা আছে। আবুল মনসুর আহমেদ রচিত এই গল্পটিতে রহিয়াছে গরিবের জন্য বরাদ্দের রিলিফ লইয়া নির্মম স্যাটায়ার। গল্পের নায়ক হামিদ তাহার সামান্য সামর্থ্যের মধ্যে বেতনের টাকার একটা বড়ো অংশ রিলিফ কাজের জন্য দান করেন এবং এই জন্য তাহাকে পরবর্তী সময়ে রিলিফ কাজের সহিত যুক্ত করা হয়। তিনি রিলিফের নামে দেখিতে পান বড়ো ধরনের প্রহসন। ক্ষুধার জ্বালায় রুগ্ণ-দুস্থ মানুষ যখন রিলিফের জন্য আকুল হইয়া আসে, তখন তাহাদের সহিত দুর্ব্যবহার করা হয়। তিনি দেখিতে পান, সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোক যাহারা আছেন, যাহাদের আদতেই সাহায্যের কোনো দরকার নাই, তাহাদের বস্তা ভরিয়া ভরিয়া রিলিফের ত্রাণসামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী পৌঁছাইয়া দিয়া আসা হয়। যেইখানে শত শত লোক বন্যাপীড়িত হইয়া দুই বেলা ঠিকমতো খাইতে পারিতেছে না, সেইখানে দেখা যায় কমিটির লোকেরা খাদ্যবিলাসে মত্ত হইয়া আছেন।

ইহা ঠিক, যেই সময় ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পটি লেখা হইয়াছে সেই সময়টাতে বাংলাদেশকে মনে করা হইত তলাবিহীন ঝুড়ি। দিন এখন বদলাইয়াছে। বাংলাদেশে এখন আর কেহ না খাইয়া থাকে না। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের শতকরা হার প্রতি বত্সরই তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় হ্রাস পাইতেছে। উন্নয়নের এক অভূতপূর্ব নজির গড়িতেছে বাংলাদেশ। তাহার পরও গরিব মানুষকে সহায়তার জন্য এখনো টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) বা কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির পিছনে প্রতি বত্সর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। ইহার দুইটি লক্ষ্য রহিয়াছে। প্রথমত, রাস্তাঘাটসহ গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার। দ্বিতীয়ত, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামের খাটিয়া খাওয়া গরিব মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। তবে অভিযোগ রহিয়াছে, এই জাতীয় কর্মসূচির জন্য যেই অর্থ বরাদ্দ হয় তাহার ৬০ হইতে ৭০ শতাংশই লুটপাট করা হয়। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে টিআর-কাবিটা প্রকল্পের দুর্নীতির প্রতিকার চাহিয়া সংবাদ সম্মেলন করিয়াছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। সেইখানে বলা হইয়াছে, টিআর-কাবিটার বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা হইতে ১০-২০ শতাংশ টাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কাটিয়া রাখিয়াছেন। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সহিত জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইবার দাবি করা হইয়াছে।

গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া টিআর ও কাবিখার বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকার এই সংক্রান্ত অনিয়ম দূর করিতেও আন্তরিক। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করিয়াছে। দুদকও এই ব্যাপারে বিভিন্ন সময় সুপারিশ করিয়াছে। তবে আমাদের প্রশ্ন, এই ধরনের প্রকল্পের প্রকৃত লক্ষ্য লইয়া। মনে রাখিতে হইবে, আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্থিতিশীল নহে। দারিদ্র্যের সূচকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত উঠানামা করে। কাহারো পরিবারে হঠাত্ বড়ো কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিলে গোটা পরিবারই দ্রুত সর্বস্বান্ত হইয়া যায়। অপরদিকে দরিদ্র কেহ পোশাক কারখানায় চাকরি পাইয়া গেলে হঠাত্ আর নিঃস্ব থাকে না। আবার এই করোনাকালে অনেকেই নূতন করিয়া নিঃস্ব হইয়া গিয়াছে। তাই দরিদ্র জনগোষ্ঠী আসলে পরিবর্তনশীল। সুতরাং টিআর-কাবিটার দুর্নীতি দূর করিবার পাশাপাশি দরিদ্রদের লইয়া যেই ডাটাবেজ রহিয়াছে, তাহারও উন্নয়ন প্রয়োজন।