প্রতিটি শিশু কিছু অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে; কিন্তু বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধে ধীরে ধীরে কিছু কিছু দায় চাপতে শুরু করে। দিন যতই গড়াতে থাকে তার দায়ের পরিধি ততই প্রসারিত হতে থাকে। মানুষ যখন থেকে অধিকার ভোগ করতে শুরু করে ঠিক তখন থেকেই অন্যের কাছে তার ঋণের বোঝাও ভারী হতে শুরু করে। যেমন—জন্মের পরপরই শিশু দুগ্ধ ও আদরযত্নের জন্য তার মায়ের কাছে চিরঋণী হয়ে যায় অর্থাত্ মায়ের কাছ থেকেই শুরু হয় তার ঋণযাত্রা। এরপর জীবনের প্রতিটি ধাপে পদে পদে সে সর্বস্তরের মানুষের কাছে ঋণী হতে শুরু করে এবং প্রতিটি মানুষ তথা সমাজের কাছে বাড়তে থাকে তার দায়বদ্ধতা। এই দায় বা ঋণ কেবল অর্থ দিয়ে পরিমাপের যোগ্যও নয় আবার অর্থের বিনিময়ে পরিশোধের যোগ্যও নয়। একেক ধরনের দায়মুক্তির পথ ও পদ্ধতি একেক রকমের। আসি আমার নিজের কথায়। সেই ছোট্ট ‘আমি’ থেকে আজকের ‘আমি’ পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে আমার ঋণ ও দায়ের শেষ নেই। কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে, মুচি, ধোপা—সবারই অবদান রয়েছে আমার জীবনে।
কারণ আমি এদেশের সবশ্রেণির মানুষের ঘাম ঝরানো টাকায় মানুষ হয়েছি। শুধু আমি নই, আমাদের প্রত্যেকের বেলায়ই এ কথাটি প্রযোজ্য। আমরা যে রাস্তায় চলাচল করি সেটা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি। আমরা যে ট্রেনে চলাচল করি সেই ট্রেন জনগণের টাকায় কেনা এবং রেললাইনটিও জনগণের টাকায় নির্মিত। আমরা যে হাসপাতালে চিকিত্সা গ্রহণ করি সেই হাসপাতাল ও চিকিত্সকরা চলেন জনগণের টাকায়। মোট কথা এদেশের প্রত্যেকটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে একে অপরের কাছে ঋণী এবং প্রতিটি মানুষেরই পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা রয়েছে।
আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাধ্যমত সেবা দিয়ে নিজেকে সেই দায় থেকে মুক্ত করতে পারি। প্রয়োজন শুধু একটু সদিচ্ছা। সামাজিক দায়মুক্তি প্রসঙ্গে চলমান করোনা প্রাদুর্ভাবকালীন কিছু ঘটনাকে প্রকৃষ্ট উদহারণ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। প্রথমত করোনা প্রাদুর্ভাবকালে এক ভিক্ষুক ভিক্ষা করে তার জমানো ১০ হাজার টাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দিয়ে সামাজিক দায়মুক্তি ও মহানুভবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। করোনাকালীন সেবা দিতে গিয়ে বরেণ্য গুণীজন, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক, সাংবাদিক, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, চিকিত্সক, বিদ্যুত্ বিভাগের দুর্যোগে আলোর গেরিলা, আম্ফানে আবহাওয়া বিভাগের আবহাওয়া বিজ্ঞানীসহ প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য বিভাগের পেশাজীবীরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেভাবে আত্মত্যাগ করছেন এবং করেছেন তাদের সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতে ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি আমার কাছে একেবারেই জরাজীর্ণ। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংগঠন ডিইউডিএসএফের প্রতিটি শিক্ষার্থীসদস্য তাদের নিজ নিজ এলাকায় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে যেভাবে ছুটে গিয়েছে সেটাও কর্তব্য পালন ও সামাজিক দায়মুক্তির চেষ্টার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। খান অ্যাসোসিয়েটসের সহযোগিতায় এলাকার প্রতিবন্ধী ও সংবাদপত্রের হকারদের খাদ্যসামগ্রী, ঈদউপহার এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে সামাজিক দায়মুক্তির চেষ্টা করেছে বরেণ্য গুণীদের সংগঠন ‘গুণীজন ফাউন্ডেশন’। এমন আরো অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে সেবা ও সামাজিক দায়মুক্তির।
অর্জিত সম্পদ শুধু নিজের জন্য নয়। এতে অন্যের হক বা অধিকার রয়েছে। আসুন অন্যের অধিকার বা হক আদায়ে আমরা আরো সোচ্চার হই। ‘মানুষ মানুষের জন্য’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে; এই করোনা-দুর্যোগে আমরা মানুষের কল্যাণে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে নিজেকে দায়মুক্ত করি। কারণ দায়মুক্তির ‘এখন’ই সময়।
n লেখক :আয়কর আইনজীবী
