আমি বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজের স্নাতক স্তরের তৃতীয় শিক্ষক। সরকারি প্রতিষ্ঠান এনটিআরসিএ কর্তৃক ২০১৯-এর জানুয়ারিতে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে কলেজে যোগদান করা থেকে এ পর্যন্ত কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে মাসিক আট হাজার টাকা দিয়ে আসছে। বিষয়টি অপমানজনক। আমার মনে হয়— আমাদের বেতনপ্রাপ্তির বিষয়টি যে প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখভাল করার কথা ছিল যেমন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনটিআরসিএ, মাউশি, জেলা প্রশাসন বা খোদ কলেজ কর্তৃপক্ষের কেউই বিষয়টি দেখেননি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিষয়গুলো নিয়ে অফিস-আদালতে দৌড়াদৌড়ি এক মস্ত হাঙ্গামা। রাস্তায় নেমে, প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলন-অনশন করে বা উচ্চ আদালতে রিট করে দাবি আদায় করা অযৌক্তিক। কারণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার জনগণের প্রাপ্য অধিকারটুকু দেওয়া। এজন্য আন্দোলন করতে হবে কেন? আর যেখানে ভরণপোষণের অর্থ নেই, সেখানে রিটের টাকা আসবে কোত্থেকে?
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বেতনের সরকারি অংশে মূল বেতন বাইশ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া, চিকিত্সাভাতা, ঈদ উত্সবভাতা, পহেলা বৈশাখ ভাতা ছাড়াও কলেজ থেকে নির্দিষ্ট বেতন পেয়ে থাকেন। সরকারি বিধান অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মতোই সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার আমাদেরও রয়েছে। আমরা যারা বেসরকারি কলেজে চাকরি করি, তাদের বেতন দেওয়ার বিধান সম্বলিত এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এর ১১.৭ ধারা মতে ‘কোনো প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত জনবল কাঠামোর অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত রাখলে অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ১০০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।’ অথচ কলেজ থেকে আর্থিক অসমর্থতার কারণ দেখিয়ে আমাদের তা দেওয়া হচ্ছে না। মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর) আজ পর্যন্ত কখনোই খোঁজ নেয়নি আমাদের কেমন বেতন দেওয়া হচ্ছে।
এখানে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে প্রথমত ডিগ্রি স্তরের অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে ডিগ্রিতে তিনজনের চাহিদা সত্ত্বেও মাউশির দুই শিক্ষকের এমপিওভুক্তির নীতিমালা, দ্বিতীয়ত বেতন দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও কলেজগুলোর শিক্ষক চাহিদাপত্র পাঠানো ও সেজন্য তাদের কোনো জবাবদিহিতা না থাকা, তৃতীয়ত মাউশি থেকে কিছু তৃতীয় শিক্ষকের নিয়োগে অসামঞ্জস্যতার কারণ দেখানো এবং চতুর্থত ডিগ্রি স্তরে দুইজনের এমপিওর নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও ২৮.০৮.১৮ তারিখের এক অফিস আদেশে ০৪.০২.২০১০ তারিখের আগে নিয়োগকৃত ডিগ্রি তৃতীয় শিক্ষকদের মানবিক দিক বিবেচনায় এমপিওভুক্ত করে বেতনের ব্যবস্থা করা হলেও এখন সেই মানবিকতার যুক্তি অগ্রাহ্য করা। সর্বশেষ ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হলো নীতিমালা অনুসারে ডিগ্রির তৃতীয় শিক্ষকদের ১০০ শতাংশ বেতনভাতার বিষয়টি কারোই দেখভাল না করা।
নীতিমালায় পরিবর্তন এনে ডিগ্রি স্তরে তিনজন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করার মাধ্যমে প্রথম সমস্যাটি নিরসন করা যায়; কেননা স্নাতক শ্রেণি চালুর ক্ষেত্রে তিনজন ও এমপিও প্রদানের ক্ষেত্রে দুজনের বিষয়টি সাংঘর্ষিক। বাকি একজনের বেতন কলেজ দেবে বলা হলেও দেওয়া হচ্ছে না। এই দায় মাউশি এড়িয়ে যেতে পারে না, তাই তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি জরুরি। দ্বিতীয় সমস্যা নিরসনে মাউশি কলেজগুলোর কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারে, তবে নীতিমালায় পরিবর্তন এনে প্রথম সমস্যার সমাধান করলে দ্বিতীয় সমস্যাটি ভবিষ্যতে থাকবে না। তৃতীয় সমস্যা নিরসনে বলা যায় কলেজ ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নিয়োগকৃত কিছু শিক্ষকের নিয়োগে অসামঞ্জস্যতার কারণে এনটিআরসিএর মাধ্যমে আসা শিক্ষকদের ভুক্তভোগী করা অনুচিত। যেহেতু এদের নিয়োগ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং এনটিআরসিএর মাধ্যমে গৃহীত পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত মেধাবীরাই এসেছে—তাই তারা এমপিওভুক্তির জোর দাবিদার।
চতুর্থ সমস্যার সমাধানে বলা যায়, নীতিমালায় ডিগ্রি কলেজের প্রতি বিষয়ে দুজন শিক্ষকের এমপিওভুক্ত করার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও আগে যেহেতু তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হয়েছে তাই এখনো তা করা উচিত।
শেষকথা হচ্ছে—জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-র দ্বিতীয় ধারায় যে ক্ষুধামুক্তির কথা বলা হয়েছে, চতুর্থ ধারায় যে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, অষ্টম ধারায় যে উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, একজন কলেজ-শিক্ষক আট হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতে থাকলে এসবের কিছুই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ডিগ্রি কলেজের জনৈক তৃতীয় শিক্ষক
