লকডাউন সাত দিন বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ নিম্ন আয়ের মানুষ

আপডেট : ২৩ জুন ২০২০, ২২:৪৪

রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউনের মেয়াদ সাত দিন বৃদ্ধি করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তারা বলছেন, সবকিছু বন্ধ রেখে পথে বসে যাচ্ছেন। তবে মধ্যবিত্তরা বাধ্য হয়ে মেনে নিলেও ইতিবাচক হিসেবেই নিয়েছেন উচ্চবিত্তরা। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলেছেন, লকডাউন সাত দিন বৃদ্ধি করায় সুফল মিলবে। পুরো এলাকাকে করোনামুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা যাবে। কারণ এখনো অনেকের সংক্রমণ ধরা পড়ছে।

লকডাউনের মেয়াদ আরো বাড়ছে কি না—এ নিয়ে কয়েক দিন ধরেই চলছিল আলোচনা। গতকাল সকালে নতুন এই ঘোষণা আসার পর অনেকের মধ্যেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে আমতলা মোড়ের অদূরে কয়েক জন মাস্ক ছাড়াই রাস্তায় নেমে লকডাউন বাড়ানোর সমালোচনা করতে থাকেন। স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের মাস্ক পরতে বললে তারা ক্ষেপে           ওঠেন। একজন বলেন, ‘কীসের লকডাউন? আমি এই সব মানি না। করোনা-টরোনা কিছু নাই। আমাদের পেটে লাথি দেওয়া হচ্ছে।’ এ নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিলে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী ও পুলিশ সেখানে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।

ভ্যানে সবজি বিক্রি করছিলেন আতাউর রহমান। তিনি বলেন, লকডাউন বাড়ানোর ঘোষণায় তিনি হতাশ। আতাউর বলেন, ‘ভাবছিলাম আইজ (মঙ্গলবার) লকডাউন শ্যাষ হইব, কাল থেইকা পুরাদমে মালপত্র আইনা বেচতে পারুম। অখন শুনি আরো এক সাপ্তাহ থাকব। গরিব মানুষের বিপদ। কীভাবে সংসার চলবে!’ বড়ো মসজিদ এলাকার একজন মুদিদোকানি জানান, ১৪ দিন ধরে তার ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ। আরো সাত দিন লকডাউন থাকলে প্রায় পুরো মাসেই কোনো আয় হচ্ছে না। এতে সংসারের খরচ চালানো মুশকিল হয়ে পড়বে। আবার মালিক তো দোকান ভাড়া কমাচ্ছেন না। পুরো ভাড়াই নিচ্ছেন। করোনার কারণে এমনিতেই কয়েক মাস ধরে সীমিত সময় দোকান খোলা রাখতে হয়েছে। তাতে আয় অনেক কমে গেছে।

অবশ্য সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীসহ উচ্চবিত্ত অনেকেই মনে করেন, লকডাউন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়েছে এটাই যা সমস্যা। তবে এলাকার মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে এটুকু করতেই হয়। কারণ এই এক সপ্তাহ কষ্ট করার ফলে হয়তো আমাদের এলাকা করোনামুক্ত হয়ে যাবে। সামান্য ভুলে যদি পরে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়, তখন আফসোস করেও লাভ হবে না।’ একই কথা বলেছেন আরো কয়েক জন। তারা বলছেন, কার্যত অবরুদ্ধ থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পেতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের দাম একটু বেশি। এটা মেনে নিলে সত্যিকার অর্থে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। সবচেয়ে বড়ো কথা, এর বিনিময়ে দেশের প্রথম করোনামুক্ত এলাকা হতে পারে পূর্ব রাজাবাজার।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ইরান ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজাবাজার এলাকার মানুষ সুন্দরভাবে লকডাউন মেনে চলেছেন। যার যা দরকার, স্বেচ্ছাসেবীরা ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে যারা অসহায় হয়ে পড়েছেন, তাদের গোপনে মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সব দিক সামলে লকডাউন সফল করায় এখানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেছে। এলাকা পুরোপুরি করোনামুক্ত করার উদ্দেশ্যে লকডাউন আরো সাত দিন বাড়ানো হয়েছে। এর পরই আমরা বলতে পরব যে পূর্ব রাজাবাজার করোনামুক্ত।’ 

করোনা সংক্রমণের ঘনত্ব বিবেচনায় ‘রেড জোন’ ঘোষিত পূর্ব রাজাবাজারকে ৯ জুন রাত ১২টা থেকে লকডাউন করা হয়। প্রথমে ১৪ দিনের কথা বলা হলেও গতকাল মঙ্গলবার শেষ দিনে এসে তা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম গতকাল পূর্ব রাজাবাজারে গিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের উদ্বোধন করে লকডাউনের মেয়াদ সাত দিন বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘পূর্ব রাজাবাজারে যে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটি আজ রাত ১২টায় ১৪ দিন পূর্ণ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এটিকে ২১ দিনে রাখতে হবে। তাই আমরা পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউনের সময় আরো সাত দিন বাড়িয়েছি। অর্থাত্ এই এলাকার মানুষকে ২১ দিন লকডাউনে থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বলেছি, ২১ দিন পরে এই এলাকার কী অবস্থা তার একটি চিত্র পর্যালোচনা করে আমাদের জনসাধারণকে জানানোর জন্য আমাকে দিতে হবে। তারা বলেছে, কাজটি তারা করবে।’