মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের চর বানিয়ালে পপি চাষের মামলায় দুই আসামির রিমান্ড শেষ হয়েছে মঙ্গলবার। আসামি নিজাম মিজি (৪৫) ও খোরশেদ মাঝিকে (৩৮) গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে আনা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর (অপারেশন) শেখ মো. আবু হানিফ ইত্তেফাককে জানান, ‘রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রায় তিন একর জমিতে বিশাল এই পপি চাষের নেপথ্যে কারা জড়িত তাও বের করার চেষ্টা রয়েছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না।’
এদিকে ঘটনা শনাক্তের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পপিখেতের কোনো মালিককে না পেয়ে আলামত হিসেবে পপিগাছ জব্দ করেছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ মেজবাহ-উল-সাবেরিনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী মাদক আইনে এই ঘটনায় সদর থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, আমরা যখন চর বানিয়ালে যাই সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকায় পপি চাষ হয়েছে দেখতে পাই। কিন্তু খেতের কোনো মালিককে পাওয়া যায়নি। আর খেতের ফসল আগেই কেউ নষ্ট করে দিয়েছে। সেগুলো আর ব্যবহার উপযোগী নেই। আলামত হিসেবে আমরা কিছু পপিগাছ জব্দ করেছি। তিনি আরো জানান, যেহেতু পাঁচ কেজি পরিমাণের চেয়ে বেশি, তাই এটি এখন আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের এখতিয়ারেও নেই। তাই নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়। জব্দকৃত পপিগাছ পরীক্ষার জন্য কৃষি অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।
পপি চাষের নেপথ্যে
পপি চাষের নেপথ্যে রয়েছে চমকপ্রদ নানা ঘটনা। এর পেছনে দেশি-বিদেশি মাদকচক্রের রাঘব বোয়ালরা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাফিয়া চক্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
বাংলাবাজার ইউনিয়ন থেকে নদী পার হয়ে চরাঞ্চল বানিয়ালে তিন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এমন নীরব জায়গায় হয়েছে, যা বলা চলে অনেকের চোখ ফাঁকি দিয়ে-ই। প্রথমে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করা হয়েছিল সয়াবিন চাষ বলে। এ অঞ্চলে কখনোই সয়াবিন চাষ হয়নি বলে কেউ অবগত নয়। আলু অধ্যুষিত এ জনপদের মানুষ তাই এই গাছ বেড়ে উঠার সঙ্গে ধারণা নিতে পারেনি। তবে ব্যতিক্রম ফুল ও ফল সবার দৃষ্টিগোচর হলেও এবং আকর্ষণ করলেও মাদক চাষিদের দেওয়াল ভেঙে পপি চাষের রহস্য উদ্ঘাটনের সাধ্য ছিল না কারো। আলু চাষিরা এ জমির পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বারবার হাত নেড়ে এবং এর গা ঘেঁষে এই নতুন ফসলের পানে কেবল তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
পপি আবাদকৃত এই জমির প্রকৃত মালিক নান্নু সরদার, রুহুল আমিন সরদার ও ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল। তাদের কাছ থেকেই এই মাদক সিন্ডিকেট এক বছরের জন্য জমি বর্গা নেয়। সংশ্লিষ্টরা টের পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত যাওয়ার আগের রাতে ট্রাক্টর দিয়ে তা মারিয়ে দেয়। পপি জমি মারিয়ে দিলেও আবার রাতের শিশির পরে মাড়ানো গাছ থেকে পপি ফুল ফুটে পুরো এলাকা আবার সাদা রংয়ে সয়লাব হয়ে যায়।
পপি চাষ করা জমির তিন মালিকের একজন নান্নু সরদার। তিনি জানান, আমার ৬২ শতাংশ, রফিকুল ইঞ্জিনিয়ারের ১০০ শতাংশ ও রুহুল আমিন সরকারের ২৪ শতাংশ জমি আলু চাষের জন্য নিজাম মিজি ও খোরশেদ মিজি ওরফে খোরইসা বর্গা নেয়। সেখানে তারা আলু চাষ না করে পপি চাষ করে যা আমরা অবগত নই। চরাঞ্চল বিধায় সেখানে আমাদের জমি বর্গা দেওয়ার পর আর যাওয়া হয় না। আমরা তিন দিন পূর্বে জানতে পারি আমাদের এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহরাব পীর কবর জিয়ারত করার জন্য নদীপাড়ি দিয়ে চরাঞ্চলে যায়। সেখানে কবর জিয়ারত করে আসার পথে ঐ পপি চাষের জমি অতিক্রম করার সময় হঠাত্ সে অদ্ভুত ফুল ও গোটা দেখে আকৃষ্ট হয় এবং তা ছবি তুলে আমেরিকা প্রবাসী বন্ধুর কাছে প্রেরণ করে। পরে তা ফেসবুকেও ছেড়ে দেয়। আমেরিকা থেকে তার বন্ধু ফুলটি পপি ফুল বলে জানালে সে বিস্মৃত হয় এবং নড়েচড়ে বসে ও প্রশাসনকে অবগত করে।
সয়াবিন চালানোর চেষ্টা
যখন এই জমিটা নিজাম মিজি, খোরশেদ আলম ও স্বপন মেম্বার পপি চাষের জন্য নিয়েছিল তখন অনেকেই তাদের প্রশ্ন করেছিল কি চাষ হবে এখানে। চারপাশের আলু চাষিরা যখন আলু আবাদ শুরু করেছিল সেই মুহূর্তে তারা আলু আবাদ না করে পপি চাষ করে। আস্তে আস্তে আলু জমিতে যখন আলু গাছ বড়ো হয়ে তা শোভা ছড়াচ্ছিল তখন পপিগাছ সমান তালে বেড়ে উঠছিল। চারপাশের চাষিরা যখন জিজ্ঞেস করল এটি কি গাছ তখন তারা তাদের বলেছিল, এটি সয়াবিনগাছ। আস্তে আস্তে যখন ফুল থেকে ফল ধরতে শুরু করল এবং শোভা বর্ধন শুরু করে তখনও সয়াবিন বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সয়াবিনগাছ বলে আর বেশি দিন চালানো গেল না। তার রং এবং ঢং দিন দিন মানুষকে আকৃষ্ট করে চলল। মুন্সীগঞ্জ জেলার ইতিহাসে এই প্রথম পপি চাষের ইতিহাস অনেকের মতে। শেষে বাংলাবাজার ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে সব রহস্যের জট খোলে।
সদর থানার ওসি আনিচুর রহমান জানান, আসামিদের গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে রিমান্ডেও আনা হয়। এখন জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এ বিষয়ে বাংলাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন পীর জানান, আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।
