চলছে এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই। এই লড়াইয়ে বড়োদের পাশাপাশি ছোটরাও নানাভাবে যুক্ত রয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকলেও অনলাইনে চলছে ক্লাস, পরীক্ষা আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। সেইসঙ্গে সুস্থ থাকার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছোটরাও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সবাইকে জানাচ্ছে কীভাবে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কেউ ছবি আঁকছে, কেউ গান করছে, কেউ নাচ করছে, আবার কেউ গল্পের বই পড়ে সময় কাটাচ্ছে। আমরা কঁচি-কাচার আসরের পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়েছি—তোমরা কে কেমন করে ঘরবন্দি সময় পার করছ এবং এ পরিস্থিতিতে তোমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা লিখে তোমাদের একাধিক ছবিসহ আমাদের পাঠিয়ে দাও। আমরা তা কচি-কাঁচার আসরে প্রকাশ করব। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকেই লেখা এবং ছবি পাঠাতে শুরু করেছে। তোমরা যারা এখনো পাঠাওনি তারা দ্রুত পাঠিয়ে দাও। আমাদের এই আহবানে সাড়া দিয়েছে আমাদের বন্ধু খুদে নৃত্যশিল্পী সাদিকা মালিহা সখ। চলো তার কাছ থেকে শুনি তার করোনার দিনগুলোর গল্প—
প্রিয় কচি-কাঁচার আসরের বন্ধুরা, আমি সাদিকা মালিহা সখ। আমি উইলস্ লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আগেই বলি, ‘কোয়ারেন্টাইন’ আর ‘লক ডাউন’ আমাদের জীবনে অন্যতম নতুন ও অমানবিক শব্দ!
এবার বলছি আমার কোয়ারান্টাইন কেমন যাচ্ছে। আমি কোয়ারেন্টাইনটা উপোভোগ করার চেষ্টা করছি। এ সময়টাতে আমি অনেকগুলো ছোটদের উপযোগী গল্পের বই, কিছু সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি।
আমার প্রিয় কাজ ছবি আঁকা। এরই মধ্যে প্রায় ৪০/৪২টার মতো ছবি এঁকেছি। আম্মুর সাথে বসে বসে সেলাই শিখছি, জানতাম না সেলাইয়েরও ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। আমি তিনটা নামসহ সেলাই শিখলাম—রান সেলাই, চেইন সেলাই আর ক্রস সেলাই। এটা অনেক মজার! জানি ফুল গাছে ফোটে, কিন্তু এখন আমি আমার পরার জামায়ও ফুল ফোটাতে পারি। এটা ঠিক ছবি আঁকার মতোই মজার! আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না বললেই নয়, সেটা হলো, আমি আগে কখনো বুঝিনি রান্না বা ঘরের কাজ করার এত কৌশল থাকে। আমি আম্মুকে কাজে সহযোগিতাসহ ঘরের অনেক কাজ সহজে করার কৌশল শিখেছি।
কোয়ারেন্টাইনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েছি, সেইসাথে কোরআন শরিফও তেলাওয়াত করার চেষ্টা করেছি প্রতিদিন। অনলাইনে অনেক খুঁটিনাটি শিখলাম স্কুলের ক্লাস করতে যেয়ে। তাছাড়া এ সময়ের সব দুষ্টুমি গুছিয়ে রাখতে প্রিয় বন্ধুর সহোযগিতায় ইউটিউব চ্যানেলও খুলেছি। খুব ভয়ে ভয়ে দুই দিন সুটিংও করেছি। খুব ভালো লেগেছে দীর্ঘ সময় আব্বুকে বাসায় পেলাম। কিছু নতুন কবিতা পড়ার সুযোগ হলো। ছোট ভাইটাকে নিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় কেটে যায় খেলাধুলায়।
এবার বলব কোয়ারাইন্টাইনের খারাপ অভিজ্ঞতার কথা। আমিসহ অনেকেই তিন থেকে চার মাস ঘর থেকে বের হতে পারি না। জানালা দিয়ে অসহায় মানুষের প্রয়োজন চাহিদামতো মেটাতে পারি না। আপনজনরা কাছে আসতে পারে না, আমরাও যেতে পারি না তাদের কাছে। ১ বৈশাখ, শবে বরাত, ঈদ এমনকি প্রিয় বন্ধুর জন্মদিনেও কাছে থাকতে পারি না। সময়মতো হাতের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায় না। মোবাইলে কল আসলে আতঙ্কে থাকি—না জানি কী খারাপ খবর আসে। কিছুদিন দেখেছি আব্বু নামাজেও মসজিদে যেতে পারছে না। প্রতিদিন টিভিতে দেখেছি মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের খবর, পত্রিকায় পড়েছি আপনজনের নির্মমতার কথা। মা-বাবাকে করোনা সন্দেহে রাস্তায় ফেলে গেছে। পাশাপাশি মানুষের মানবিকতার কথাও পড়েছি। মহামারি করোনাকে উপেক্ষা করে অজানা-অচেনা মানুষগুলো স্বজনের মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
করোনা গেলে স্কুলের মাঠটা আবার আমার করে নিতে চাই। নাচের ক্লাসে তবলার তালে আবার তাল মেলাতে চাই।
পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। আমি চাই সবকিছু আগের মতো ঠিক হয়ে যাক। সবাই আবার স্বাভাবিকভাবে বাঁচুক। নিশ্চিন্তে সবাই সবার আপনজনকে সাথে নিয়ে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে বেঁচে থাকুক।
তৃতীয় শ্রেণি, উইলস্ লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ
লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]
