করোনা মানুষকে ঠেলিয়া দিতেছে শিকড়ের কাছে

আপডেট : ২৪ জুন ২০২০, ২২:০৫

মানুষ যখন সবচাইতে অধিক বিপদে পড়ে তখন সে শিকড়ের নিকট চলিয়া যায়। করোনা ঢাকা শহরের অনেক মানুষকে সেই শিকড়ের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর করোনা কী ভয়াবহ প্রভাব ফেলিয়াছে—এই বিষয়ে প্রতিনিয়তই অসংখ্য জরিপ ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হইয়াছে। আমরাও বিগত কয়েক মাসে এই বিষয়ে লিখিয়াছি। জীবন ও জীবিকার এক নিষ্ঠুর দ্বন্দ্ব তৈরি করিয়াছে করোনা ভাইরাস। ঢাকাসহ সমগ্র দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহিত কথা বলিয়া একটি বেসরকারি সংস্থা গত মাসে জানাইয়াছে যে, করোনার কারণে ৩৬ শতাংশ লোক চাকুরি বা কাজের সুযোগ হারাইয়াছেন। ৩ শতাংশ লোকের চাকুরি থাকিলেও বেতন পাইতেছেন না। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যাহারা কাজ করিয়া থাকেন, তাহাদের ৬২ শতাংশই কাজের সুযোগ হারাইয়াছেন। দেখা যাইতেছে, করোনার কারণে কেবল ঢাকা জেলার মানুষেরই আয় কমিয়াছে ৬০ শতাংশ। ফলে, রাজধানীতে বসবাস করা মানুষ ব্যয় কমাইবার জন্য বাসা বদল করিয়া অল্প ভাড়ার বাসায় উঠিতেছেন। অনেকে গ্রামেও চলিয়া যাইতেছেন।

আশঙ্কাজনক তথ্য হইল, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সমগ্র দেশের প্রায় ১ কোটি লোক কাজ হারাইয়াছেন। আর তৈরি পোশাক খাতে কাজ হারাইয়াছেন ১ লক্ষ লোক। এই তথ্য দিয়াছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের এক পরিচালক। শুধু বস্তিবাসীই নহে, অনেক চাকুরিজীবীও কাজ হারাইয়া মফস্সলে চলিয়া যাইতে বাধ্য হইতেছেন। অর্থনীতিবিদেরা বলিতেছেন, করোনা শুধু আর্থিক বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতেছে না, মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করিয়া তুলিতেছে অধিকাংশ মানুষকে। করোনায় কাজ ও চাকুরি হারানো মানুষের যদি পরবর্তী সময়ে আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ না হয়, তাহা হইলে বৃহত্তর মানুষের জীবনমান আরো নিচে নামিয়া যাইবে। কেহ কেহ দারিদ্র্যসীমার নিচেও চলিয়া যাইবেন। বলা যায়, করোনার কারণে ঢাকা শহর হালকা হইতেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৭০ সালের ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ লক্ষ। ১৯৮১ সালে ছিল ৪০ লক্ষ। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা বর্তমানে ১ কোটি ৭০ লক্ষ—যাহা ২০৩০ সালের মধ্যে পৌঁছাইয়া যাইবে ২ কোটি ৭৪  লক্ষে। ঢাকার জন্য ইহা বিশাল চাপ। করোনার কারণে সেই চাপ হ্রাস পাইলেও মূল সমস্যা কিন্তু রহিয়াই যাইবে। সেই সমস্যা হইল, রাজধানীকেন্দ্রিক সকল সুযোগ-সুবিধা। মানুষ ঢাকায় আসে কাজের জন্য, শিক্ষার জন্য, বাণিজ্যের জন্য, চিকিত্সার জন্য এবং আরো নানাবিধ প্রয়োজনে। আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার কারণে আমাদের অর্থনীতি, বাণিজ্যও ঢাকাকেন্দ্রিক। অধিকাংশ পোশাকশিল্প ঢাকাকে বৃত্ত করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে। গ্রাম হইতে নদীভাঙা মানুষ তাই ঢাকাতেই কাজ করিতে আসেন, শহরে বস্তি গড়িয়া তোলেন। দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ঢাকায়, আমাদের সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও ঢাকাকেন্দ্রিক।

এখন এই করোনাকালে সময় আসিয়াছে মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত চিকিত্সা, কর্মসংস্থান, উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবস্থা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছাইবার ব্যবস্থা করা। এই জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ পরিকল্পনার। ইহাতে ঢাকাও বাঁচিবে আবার মানুষেরও দুর্ভোগ কমিবে। করোনার নিকট হইতে এইটুকু শিক্ষা গ্রহণ করা যাইতেই পারে।