ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
সামষ্টিক অর্থনীতিকে বেগবান করতে এ দুঃসময়ে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয় দরকার। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ২০২০-২১ প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। এ বাজেটে অর্থনীতির একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে মনে করি, যুদ্ধকালীন তত্পরতার মধ্য দিয়ে নিম্নোক্ত খাতসমূহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে : (১) কৃষি খাত, (২) আমদানিনির্ভর শিল্প স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার করে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ, (৩) স্বাস্থ্য খাত, (৪) শিক্ষা খাত, (৫) সিএমএমই (কটেজ, স্মল, মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ) খাত, (৬) গ্রামকে স্মার্ট শহর বানানোর খাত। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারপ্রধান স্বয়ং ৩১টি ধাপে যে নীতিমালা ঘোষণা করেছেন, সেটির বাস্তবায়নের রূপরেখা অবশ্যই বাজেটে প্রতিফলিত হবে বলে বিশ্বাস করি। প্রয়াত বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যসমালোচক ড. আনিসুজ্জামান একবার বলেছিলেন যে, আমলারা যদি পরোপকারী হয় তবে তা জনকল্যাণে লাগে (মোবাশ্বের আলীর স্বর্ণপদক পুরস্কার অনুষ্ঠান, ২০১৪)। দেশের এ ক্রান্তিকালে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের সিংহভাগ দায়দায়িত্ব আমলাদের ওপর পড়ে। কৃষি খাতে সুন্দরভাবে বোরো মৌসুমের ধান কাটা হয়েছে। এখন সরাসরি ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছ থেকে ধানচাল সংগ্রহ করা দরকার। ৬৮ হাজার গ্রামে যদি এক বিঘা অনাবাদি জমির ওপর সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা যায়, তবে অনেক দিন ধরে স্থানীয় মানুষ ঐসমস্ত পণ্যাদি গ্রহণ করতে পারবে। পাশাপাশি পচনশীল পণ্যগুলো নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, সততা এবং নৈতিকতার প্রয়োজন রয়েছে।
যেহেতু সরকার গ্রামকে স্মার্ট শহর বানাতে চেয়েছে— কমিউনিটি ক্লিনিক, স্যাটেলাইট ক্লিনিক ও টেলি-মেডিসিনের উদ্যোগ অনেক আগেই নিয়েছে। এখন সময় এসেছে তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করে যেসমস্ত স্থানে অসংগতি আছে সেগুলো দূর করার জন্য পিকেএসএফের মাধ্যমে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহকে কাজে লাগানো। অবশ্যই এ খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। সরকারপ্রধান ঈদের আগে পরিবারপ্রতি নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ৮ লাখ বেনিফিশিয়ারিকে রূপালী ব্যাংক লিঃ-এর শিওর ক্যাশের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, প্রশাসন যন্ত্র এবং সেখানকার স্থানীয় অর্থনীতির জন্য কোনটি গ্রহণযোগ্য—এ ধরনের আমদানি বিকল্পায়ন শিল্পপ্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ডেলেভপমেন্ট ব্যাংককে কাজে লাগানোর দিকনির্দেশনা রাজস্ব নীতিতে থাকতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের উন্নয়নে অধিকতর সম্পৃক্ত করার জন্য কৃষি ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া দরকার। এদিকে সফল এনজিওদেরও স্ব-উপার্জিত পরিবার তৈরির মডেলের প্রতিফলন বাজেটে প্রত্যাশা করছি। পিকেএসএফের সমৃদ্ধ কর্মসূচিটি একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি এবং এটি এ দুর্যোগের সময়ে কাজ করতে পারে। প্রত্যাশা থাকবে এবারের বাজেটে পিকেএসএফের সমৃদ্ধি কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে—যাতে করে ব্যাস্টিক অর্থনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে বেগবান করতে পারে। শহরেও খালি জমি ও ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের আশপাশে ফল-ফলাদি, আনাজ, তরিতরকারি চাষের ওপর যে গুরুত্ব সরকার দিচ্ছে তার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে অর্থায়নের ব্যবস্থা এবং সে অর্থায়নটি অবশ্যই বাজেটে যাতে বরাদ্দ করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। স্থানীয় অর্থনীতিতে কী ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যায় ও স্থানীয় পর্যায়ের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা যায়, সেজন্য একটি মডেল তৃণমূল পর্যায় থেকে জরুরি ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এবং পরিকল্পনা কমিশনের কাছে প্রেরণ করা উচিত। সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিকে বেগবান করার বিকল্প নেই—এজন্য বাজেটে কর্মসূচি দরকার। চলতি বাজেটে প্রকল্প হিসেবে একটি জেলায় শস্যবিমা করার কথা ছিল। সেটি বিবেচনায় এনে সমগ্র দেশে শস্যবিমা করার জন্য উদ্ভাবনীমূলক কর্মসূচি যাতে বিমা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।
দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশের বিত্তবানরা যখন ভালো সময়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যে আয় করেন তখনো ঠিকমতো কর দেন না। ফলে কর আদায় করাটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। দেখা যাচ্ছে যে, মার্চ মাস পর্যন্ত চলতি বাজেটের টার্গেটের ১০ শতাংশের কম আদায় হয়েছে; কিন্তু লকডাউন ও বৈশ্বিক মহামারি শুরু হওয়ার পর কিছুই করার থাকে না। কেননা, কর্মহীন ও আয়প্রবণ মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অবস্থা একই। এবারের বাজেট হতে হবে ভিন্নমাত্রার। এ বাজেটটি বঙ্গবন্ধুর আমলের প্রথম বাজেটের আদলে গঠিত হতে হবে। তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি, উদারীকরণ নীতি, বিশ্বায়ন নীতি থেকে খানিকটা হলেও সরে আসতে হবে। এবারের বাজেটের মূল উপজীব্য হতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনীতিকে সচল করা এবং স্থানীয়ভাবেই কর্মহীনদের কর্মসংস্থান করা।
আসলে গ্রামকে স্মার্ট শহর বানানোর আওয়ামী লীগ যে উদ্যোগ নিয়েছিল, এবার সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। কেননা, অভ্যন্তরীণ স্থানীয় পুঁজিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়বান্ধব পরিবেশে কাজে লাগানোর জন্য প্রশাসনকে কাজ করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তা স্থানীয় পর্যায়ে যাতে গড়ে ওঠে এবং আমদানি বিকল্পায়ন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যেহেতু সমগ্র বিশ্ব একটি সংকটকালীন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেহেতু প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষে আগের মতো অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসীরা যে পরিমাণ অর্থ অফিশিয়াল চ্যানেলে পাঠিয়েছিল, তা দুই-তৃতীয়ংশে নেমে আসার সম্ভাবনা আগামী অর্থবছরে আছে—এটি মনে রাখতে হবে। কোথায় কোথায় অর্থ পাওয়া যাবে, তার বাস্তবতা মাথায় রেখে বাজেট প্রণীত হবে বলে আশা করা যায়। কেননা, এ বৈশ্বিক তাণ্ডব ধনী-দরিদ্র উভয় শ্রেণিই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পর্যায়ে যতটুকু সম্ভব কৃচ্ছ্রসাধন করা বাঞ্ছনীয়। সরকার যে ১০টি যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে সেগুলোতেও এখন কাটছাঁট করে আপত্কালীন বন্ধ রাখতে হবে। এ দুঃসময়ে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী ও সাহায্য সংস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুদান ও ঋণ অর্থসংস্থানের একটি বড় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে এডিবির পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ব্রিকস ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে শর্তহীন ঋণ ন্যূনতম খরচে কতটুকু পাওয়া যায়, সেজন্য প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি বিদেশে ধনবান রয়েছেন তারাও যাতে একটি নির্দিষ্ট ফান্ডে অর্থ দেন এবং তাদের প্রেরিত অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহূত হয়ে মানুষের উপকারে আসে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যখন কোনো প্রবাসী কোনো অনুদান দেয়, সে আশা করে তার অর্থটির যাতে সদ্ব্যবহার হয়। শেয়ারবাজার ঠিক করার নাম করে কয়দিন পরপর অর্থ নিয়ে গিয়ে যে ধরনের ভেলকি দেখানো হচ্ছে তার ধূম্রজাল কেটে বেরোতে হবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজন শেয়ারের অভিহিত মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়া দরকার। যেসব খাতে দেশি প্রতিযোগীরা নেই, সেক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকে উত্সাহিত করতে হবে। যারা ঋণখেলাপি তারা যে অংশটুকু এই দুঃসময়ে পরিশোধ করবে, তাতে তাদের ওপর কোনো সুদ নেওয়া হবে না বিধান রেখে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে যারা বিদেশকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে বৈধ বা অবৈধ যেভাবেই অর্থ প্রেরণ করে থাকুন না কেন, তারা সে অর্থ দেশে ফেরত আনতে চাইলে সে অর্থের জন্য আবার কোন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ বা জরিমানার আওতায় না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যদিকে কালো টাকা সাদা করার বিধান, সে আবাসন খাতেই হোক কিংবা কর্মহীন মানুষের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে ছোটখাটো শিল্প, কৃষিনির্ভর শিল্প অথবা মাঠে নির্দিষ্ট ফসলের বাইরে ও অন্যান্য ফসল তরিতরকারি অন্তর্বর্তীকালীন খাতে লাগানো যায়, সেজন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার পার্সেল ট্রেন চালু করেছে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ে যেসব উত্পাদনকারী আছেন তারা অনেকেই তা জানেন না। এজন্য দরকার হচ্ছে বিনা মূল্যে ইলেকট্রনিক-প্রিন্ট মিডিয়া ও রেডিওতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পার্শেল ট্রেনের মাধ্যমে শহরে পণ্য সরবরাহ করার সুবিধা সম্পর্কে জ্ঞাত করা। অনেক জায়গায় লকডাউনের কারণে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাজার খোলা না থাকায় পাইকাররা বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন না। এ দুরবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরাসরি সংগ্রহ করা যায়, তার জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকতে হবে। আবার কেউ যদি গ্রামীণ অঞ্চলে বা কোথাও নিজস্ব সম্পত্তিতে কোনো শিল্প স্থাপন করতে আগ্রহী হয়, তাহলে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া দরকার।
বৈশ্বিক মন্দার ঢেউ যাতে দেশে না লাগে সেজন্য সরকার যেসব প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক বরাদ্দ আগামী বাজেটে রাখতে হবে। এই দুর্যোগে যারা ফ্রন্ট লাইনে ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, আর্মি, ব্যাংকার, পোস্ট অফিস, সাংবাদিক, জরুরি রপ্তানি ইত্যাদি কাজ করছেন তাদের জন্য যেন বিমা কোম্পানি সুস্পষ্ট নীতিমালায় বিমার ব্যবস্থা যেন রাখেন। বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য—লাইফ এক্সপেনটেন্সি বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর। অথচ ৫৫ বছরের পর এদেশের বিমা কোম্পানিগুলোর বিমা প্রকল্প নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমার ব্যাপারে বাজেটে একটি দিকনির্দেশনা থাকতে হবে যাতে একটি ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ও আরেকটি ৬১ বছর থেকে ৭২ বছর পর্যন্ত বয়সের লোকদের বিমা গ্রহণের ব্যবস্থা করা যায়।
n লেখক :সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক
