ফারহান ইশরাক
অনলাইন ক্লাসের সম্ভাব্যতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। যদিও বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু হয়েছে, কিন্তু ব্যাপক আকারে সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সুবিধা চালুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা একটু কঠিন বৈকি। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে, যেমন—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাধিক্য, ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক অস্বচ্ছতা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অপ্রতুলতা, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের স্বল্পসংখ্যক ব্যবহার, অবকাঠামোগত চাহিদা প্রভৃতি। তাই অনলাইন ক্লাস শুরুর পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয় নিয়েও ক্রমাগত ভাবতে হচ্ছে।
অনলাইনে ক্লাস গ্রহণ ও সকলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। যেহেতু ইতিপূর্বে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি, তাই এ বিষয়ে জোরালো প্রস্তুতি না থাকাটাও খুবই স্বাভাবিক। তবে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অস্বচ্ছতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীদের একটা প্রধান অংশ আসে গ্রামাঞ্চল থেকে, যাদের বেশির ভাগই নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই করোনার এই প্রাদুর্ভাবকালে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে, এই পরিস্থিতিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ খানিকটা কঠিন এবং ব্যয়সাধ্যও বটে।
দ্বিতীয়ত, কিছু শিক্ষার্থীর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ধীরগতির নেটওয়ার্ক এ প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশের জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে অনেক স্থানেই দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ নেই, এর ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের ক্লাসে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। তৃতীয়ত, সিংহভাগ শিক্ষার্থী তাদের প্রয়োজনীয় পাঠ্য ও রেফারেন্স বই হলে কিংবা মেসে রেখে এসেছেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠ্যসূচির এই বইগুলোর পিডিএফ সংস্করণ বিনা মূল্যে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অনলাইনে ক্লাস নিলেও তা থেকে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যসূচির মূল অংশ বাস্তবিকই শিখতে বা চর্চা করতে পারবে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়াও অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার ফলে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়া কতটুকু কার্যকর থাকবে সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।
তবে শুধু সমস্যার কথা ভেবেই এ থেকে পিছিয়ে আসা উচিত হবে না, বরং এই সমস্যাগুলোর কৌশলগত ও সর্বজনীন সমাধানের বিষয়ে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অভিজ্ঞদের মতামত গ্রহণের প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে সকল শিক্ষার্থীর জন্য মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ সরবরাহ করা সম্ভব নয়, এই দাবি উত্থাপনও যথেষ্ট অযৌক্তিক। তবে এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা। যদি ৮০ বা ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে, সেক্ষেত্রে বাকি ১০ বা ২০ শতাংশের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে অনলাইন ক্লাসের আয়োজন করা যায়। অন্যথায়, এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বৈষম্যের শিকার হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে পাঠ্যবইগুলোর ‘পেইড ভার্শন’ সংগ্রহ করে তা শিক্ষার্থীদের ই-মেইলের মাধ্যমে প্রেরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পর পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে উন্মুুক্ত আলোচনার ব্যবস্থাও এ সমস্যাগুলোর সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়াও টেলিকম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চুক্তির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ সুবিধা প্রদান করলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই তা উপকারে আসবে।
বস্তুত, অনলাইনে পাঠদানের সিদ্ধান্ত হতে হবে সম্মিলিত চিন্তার ফসল। সব ধরনের সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে এবং এ থেকে উপকৃত হবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
