ভুলের বোঝা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২০, ২০:০৬

আকাশের দিকে তাকিয়ে আহ্লাদে গদগদ হয়ে বললাম, ‘জানো রিয়া, তুমি আমার ভাবনার চেয়েও সুন্দর।’

‘ও আচ্ছা, এতদিনে আসল কথাটা মুখ ফসকে বের হয়ে গেল, না? আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম,’ দাঁত কিড়মিড় করতে করতে রিয়া বলল, ‘সত্যি করে বলো, এই ভাবনা মেয়েটা কে? তার সঙ্গে তোমার কতদিনের সম্পর্ক?’

কিটো ডায়েট করা এই আমি গত তিন মাস ধরে ডাক্তারের দেয়া চার্টের বাইরে কিছুই খাইনি। রিয়ার কথা শুনে বিষম খেলাম। বিষম জিনিসটা স্বাদে-গন্ধে কেমন—সেটা যে না-খায়, তাকে লিখে বোঝানো যাবে না।

‘আরেহ্, আমার ভাবনা মানে... না না, আমার কেউ না...’ রিয়াকে কী বলে যে বোঝাব— নিজেই বুঝে উঠতে পারি না, ‘...ইয়ে রিয়া, ভাবনা মানে আমার কল্পনা আর কি... হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি আমার কল্পনার চেয়েও সুন্দর।’

‘ভ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ...’। রিয়া সত্যি সত্যি কান্নার অভিনয় করল, ‘প্রথমে ভাবনা, এবার কল্পনা! কারা এরা? তুমি আমাকে আগে কেন তাদের কথা বলোনি? প্রতারক, ভন্ড, ছোটলোক...’

নিজেকে সামলাতে পারলাম না। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে এমনিতেই আমি একটু বেকায়দায় থাকি। ভুল বুঝে রিয়া আমাকে ভণ্ড আর প্রতারক বলেছে, সেটা না-হয় মেনে নেয়া যায় কিন্তু ছোটলোক বলা মানে তো আমাকে ডিরেক্ট অপমান করা।

‘শোন্ গাধী, তোর মতো মগজহীন একটা মেয়ের সঙ্গে কেন যে সম্পর্ক গড়তে গেলাম—সেটা ভেবেই মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু চুলও তো বেশি নেই। এরকম হলে তো বিয়ের আগেই টাক হয়ে যাব...। তখন তোর বাপ কি তোর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে? প্রেমিকারা এত বেকুব হয় কীভাবে? ওফ্!’

‘কী হইছে তোমার? বিড়বিড় করে কী বলছো, হ্যাঁ?’ ধমকে ওঠে রিয়া, ‘কথার উত্তর দিচ্ছ না ক্যানো?’

‘উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম—সবই তো দিচ্ছি। তুমিই তো বুঝতে পারছো না...’

‘মামা, আমনের প্রবলেমটা আমি মনে হয় ধরতে পারছি,’ রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকায়। তারপর রিয়াকে উদ্দেশ করে বলে, ‘আফামনি, উনি কল্পনা কইতে ইমাজিন না কী-জানি কয়, হেইডা বোঝাইছে মনে লয়...’

আমি চলন্ত রিকশার সিট থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম, ‘মামা, ইউ আর গ্রেট! একদম ঠিক বলছো...।’ রিয়ার চোখে তাকিয়ে যুক্তিজয়ের ভঙ্গিতে বললাম, ‘হ্যাঁ, কল্পনা মানে ইমাজিনেশন বুঝিয়েছি। তুমি আমার ইমাজিনেশনের চেয়েও সুন্দর। আন্ডারস্ট্যান্ড?’

রিয়া আন্ডারস্ট্যান্ডের ধারে-কাছেও গেল না। বরং আরো চটে উঠল, ‘অ্যাই রিকশাওয়ালা, তুমি ওকে মামা ডাকছো আর আমাকে আফামনি ডাকছো ক্যানো, হ্যাঁ? কল্পনা মানে ইমাজিনেশন বোঝো আর এইটা বোঝো না?’

‘হে হে হে...’ প্যাডেল চাপতে চাপতেই রিকশাওয়ালা বলল, ‘তাইলে কি আপনারে মামী ডাকুম?’

‘তোমাকে কিছুই ডাকতে হবে না। রিকশা থামাও। থামাও বলছি।’

রিকশা থেমে যায়। আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে। যাচ্ছিলাম শিল্পকলা একাডেমিতে। আমার লেখা প্রথম মঞ্চনাটক ‘শূন্য বাতাস’-এর আজ উদ্বোধনী মঞ্চায়ন। ‘জাগতিক’ দলের কর্ণধার সাইফ রানা নাটকটি নির্দেশনা দিচ্ছেন। সাইফ ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম—উদ্বোধনী মঞ্চায়নটা আজ করতে। কারণ আজ রিয়ার জন্মদিন। তাকে সারপ্রাইজ দেব বলে আগে থেকে কিছুই বলিনি। কিন্তু মঞ্চের আগে তো রাস্তায়ই নাটক শুরু হয়ে গেল মনে হয়! শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত রিয়াকে কীভাবে টেনে নেব—সেটাই এখন একমাত্র ভাবনা। না না, ভাবনা নয়— চিন্তা বা দুশ্চিন্তা! কেন যে শুধু-শুধু তাকে খুশি করতে গিয়ে কাব্যের আশ্রয় নিলাম...? ধুর! বোঝা উচিত ছিল, কিছু কিছু মেয়ে প্রেমে পড়ার আগে কবিতার লাইন মুখস্থ করে, আর প্রেমে পড়লে প্রেমিকের বাপের নামও ভুলিয়ে দেয়।

ভাড়া মিটিয়ে ইশারায় রিকশাওয়ালাকে কৃতজ্ঞতাসূচক ধন্যবাদ দিলাম। রিয়া ফুটপাত দিয়ে ঠক ঠক করে হাঁটছে। হাইহিলের শব্দ। আশার কথা, রিয়া এগোচ্ছে শিল্পকলা একাডেমির দিকেই। মোবাইলে সময় দেখলাম। আর ২৫ মিনিট বাকি। নাটকের রচয়িতা হিসেবে মঞ্চায়নের আগে আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার কথা। কিন্তু বক্তব্যের সময় তো রাজপথেই শেষ হয়ে যাবে মনে হয়।

‘রিয়া, কই যাও? নাটক দেখবা না?’

‘গত ১০ মাসে তো তোমার কম নাটক দেখলাম না। আজ সিনেমা দেখলে হয় না?’

খোঁচাটা নীরবে হজম করি। জন্মদিনে রিয়াকে রাগাতে চাই না। তা ছাড়া ‘শূন্য বাতাস’ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়ন কিছুতেই মিস্ করা যাবে না।

‘রিয়া, নাটক শুরু হতে তো মাত্র ২৫ মিনিট বাকি। হেঁটে গেলে তো সম্ভব না।’

‘তাহলে দৌড়াই, চলো। আমি নায়িকা, তুমি ভিলেন। রাজপথে আমাকে তাড়া করছো। আমি বাঁচাও-বাঁচাও বলে চিত্কার করতে করতে দৌড়াচ্ছি...। তোমার তাতে ভালো হবে। শরীরের মেদ-ভুঁড়িও কমবে...।’

নাহ! অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হওয়া এই মেয়ের মাথায় পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস ছাড়া আর কিছুই নেই। আগে জানলে ফিলোসফি পড়া কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেমই করতাম না। আমি বাংলায় মাস্টার্স। এই বাংলায়, ‘বাংলা’র মেয়ের তো অভাব ছিল না। সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে প্ল্যানটা প্রাইজলেস হোক—সেটা চাই না। তাই উপায়ান্ত না পেয়ে রিয়াকে পুরো ঘটনা খুলে বলি। তাতে হিতে বিপরীত হয়।

‘তোমার লেখা প্রথম মঞ্চনাটক আজ প্রদর্শিত হবে—এটা আমাকে আগে বলোনি ক্যানো?’

‘আরে বাবা, আগে বললে কি আর সেটা সারপ্রাইজ হতো?’

‘এখন কি আর সারপ্রাইজ হয়েছে?’

‘না। হয়নি। সেটা তোমার বোঝার ভুলে।’

‘কী! আমার ভুল?’

‘না না, তোমার ভুল না। তোমাকে বোঝাতে আমার ভুল!’

‘ওহ। ঠিক আছে। চলো।’

রিকশায় ওঠার পর রিয়া অন্যমনস্কভাবে জানতে চায়, ‘আচ্ছা, তোমার নাটকের নায়ক-নায়িকার নাম কী?’

‘নায়কের নাম সীমান্ত আর নায়িকার নাম...’ আমার মাথাটা হঠাত্ চক্কর দিয়ে ওঠে। জিহ্বার ডগায় চলে আসা নায়িকার নামটা বলতে গিয়ে থেমে যাই। এটা নেহায়েত দৈব ঘটনা। কিন্তু রিয়াকে কোন সাহসে বলি যে, ‘শূন্য বাতাস’ নাটকের নায়িকার নাম—ভাবনা!

‘কী হলো, নায়িকার নামই ভুলে গেছ নাকি!’ রিয়ার কণ্ঠে টিটকারি টের পাই।

‘আরে না, নায়িকার নাম এখন বলব না। একটু পরই তো জানতে পারবে।’

রিয়ার ফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করে। কেউ একজন তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আমি এই ফাঁকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে সাইফ রানা ভাইকে এসএমএস করি—ভাই, ‘যেভাবেই হোক নাটকের নায়িকার নাম পাল্টে ‘রিয়া’ করতে হবে। বিস্তারিত পরে বলব। প্লিজ, আমাকে বাঁচান!’

রিকশা শিল্পকলা একাডেমির গেইটে এসে থামে। রিয়ার কথাও শেষ হয়। রিকশা থেকে নামতেই দেখি সাইফ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। উদ্বিগ্ন চেহারা। চোখাচোখি হতেই আমি ইশারায় রিয়াকে দেখাই। বুঝে হোক বা না-বুঝে, উনি মুচকি হেসে সামান্য মাথা নাড়ান। তারপর এগিয়ে এসে বলেন, ‘আরে সোহেল, তোর, মানে তোদের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। শুভ জন্মদিন রিয়া।’

‘ধন্যবাদ সাইফ ভাই।’ রিয়া হাসিমুখে জবাব দেয়, ‘আসলে আমার জন্যই একটু দেরি হয়ে গেল।’

সাইফ ভাই দ্রুতপায়ে হলের দিকে ছোটেন। পেছন পেছন আমি আর রিয়া। রিয়ার উত্ফুল্লতা ও উত্তেজনা আমি টের পাই। কিন্তু সঙ্গে এই আশঙ্কা মনের মধ্যে বাজতে শুরু করে—প্রায় তিন মাস ধরে রিহার্সেল করা ‘শূন্য বাতাস’ নাটকের নায়িকা ভাবনা মঞ্চে ওঠার ১০ মিনিট আগে নিজেকে রিয়া হিসেবে মানিয়ে নিতে পারবে তো? সে যদি পারেও, প্রায় ১৬ জন সহঅভিনেতা-অভিনেত্রী তাদের সংলাপে যদি একবারও ভুল করে নায়িকাকে ভাবনা বলে ডেকে বসে তো আমার দফারফা! কারো একজনের ভুলের বোঝা টানতে হবে আমাকেই।

হলের ভেতরে ঢুকে পড়ি আমরা। মাইকে ঘোষণা হয়—এবার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ‘শূন্য বাতাস’ নাটকের রচয়িতা সোহেল হাসানকে।

আমি ত্রস্ত পায়ে মঞ্চের দিকে এগোই। এক পলক রিয়ার দিকে তাকাই। সে দুই ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে আমার উদ্দেশে একটা ইঙ্গিত করে। এটাকে কেতাবি ভাষায় বলে ‘ফ্লাইং কিস’ বা ‘উড়ন্ত চুমু’। কিন্তু আমার মাথাটা হঠাত্ শূন্য মনে হয়। গুছিয়ে রাখা বক্তব্য বাতাসে উড়ে গেছে যেন। সেখানে ভর করেছে ভুলের বোঝা! অদৃশ্য কিন্তু ভীষণ ভারী। কী হবে একটু পর? ভাবনা ও কল্পনাবিষয়ক রিয়ার ভুল কি ভাঙবে? নাকি এর জের ধরে ভাঙবে আমাদের সম্পর্ক!

এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে নায়িকা ভাবনাকে উদ্দেশ করে নায়ক সীমান্তর বলা নাটকের শেষ সংলাপ, যেটি আমারই লেখা—কাউকে ভুল বোঝা সহজ কিন্তু তার মূল বোঝা কঠিন।