করোনাকালীন এই সময়ে সরকার যে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে তা ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয়। রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছেন তা ঝুঁকিপূর্ণ। করোনার এই মহাসংকটে সারাবিশ্বের অর্থনীতি বিধ্বস্ত এবং এর বটম লাইন তথা বাউন্স ব্যাক কিভাবে হবে তা পৃথিবীর কোনো পণ্ডিতও বলতে পারছেন না। তবে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আদায় যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি প্রকৃতিও সহায়ক হতে হবে। এই মহামারির সময়েও অর্থমন্ত্রী যে বাজেট দিয়েছেন তাকে সাধুবাদ জানাই। পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের যে আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের প্রত্যাশা চলতি বছরের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় যেন রাজস্ব আয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই করা হয়। রাজনৈতিক প্রকল্প বাদ দিয়ে অগ্রাধিকার প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে। ইত্তেফাকের সঙ্গে বাজেট নিয়ে আলাপচারিতায় কথাগুলো বলেন, মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। তিনি এইচ এন এস গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড যানবাহন আমদানিকারক ও ডিলার্স (বারভিডা) সমিতির সাধারণ সম্পাদক।
রাজনৈতিক প্রকল্প বলতে আপনি কি কোনো উদাহরণ দিতে পারবেন? এই ক্ষেত্রে শহীদুল ইসলাম বলেন, আমি মনে করি কিছু কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের মতো অর্থনৈতিক অবস্থায় একশ বার ভাবা উচিত। যেমন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের যৌক্তিকতা কী? যেখানে হাজারো ঝুঁকি নিয়ে সড়কপথে যান চলাচল হচ্ছে, সড়কপথকে ছয়/আট লাইন বাস্তবায়ন না করে কি কারণে রেলপথের কাজ চলছে তা আমার অজানা। এই প্রকল্প সরকারের জন্য কোন্ পর্যায়ের ভ্যালু এডিশন করছে তা বোধগম্য নয়। এই রকম আরো অনেক প্রকল্প হচ্ছে যা অগ্রাধিকার তালিকায় কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে আয়করের সর্বনিম্ন সীমা সাড়ে ৪ লাখ করা উচিত। বয়স্ক ও মহিলাদের জন্য তা ৫ লাখ করা উচিত। একইভাবে আয়করের অন্য স্তরগুলোরও সমন্বয় সাধন জরুরি। বাজেটে অগ্রিম আয়কর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী যে প্রস্তাব রেখেছেন, তা দুঃখজনক। মোটরগাড়ির ওপর অনুমিত কর বাড়ানো হয়েছে অযৌক্তিকহারে। অনূর্ধ্ব ১ হাজার ৫০০ সিসি গাড়ির কর ১৫ হাজার টাকা থেকে একলাফে উন্নীত করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকায়। আর ১ হাজার ৫০০ সিসির ওপরে অনূর্ধ্ব ২ হাজার সিসি পর্যন্ত গাড়ির কর ৩০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। এর ওপরের সিসি গাড়ির করও বাড়ানো হয়েছে অত্যধিকহারে। তবে মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তরা সাধারণভাবে ওপরের দুই শ্রেণির গাড়িই বেশি ব্যবহার করে থাকেন। একসঙ্গে এতো কর বৃদ্ধি তাদেরকে নিঃসন্দেহে চাপের মধ্যে ফেলবে। করারোপের ক্ষেত্রে নতুন পুরোনোকে এক ক্যাটাগরিতে ফেলা অযৌক্তিক। এক্ষেত্রে সরকারকে যদি করতেই হয়, সেক্ষেত্রে গাড়ি নিবন্ধনের ভিত্তি বছর ধরে সেটি দুই বা তিন স্তরে করা যেতে পারে। তদুপরি, এ কর দিতে হয় অর্থ বছরের যে কোনো সময়ে গাড়ি ফিটনেসকালে। একজনের অগ্রিম কর প্রযোজ্য না হলে তাকে দিতে হচ্ছে অগ্রিম কর। আবার এমন করদাতাও আছেন যাদের কর দায় ঐ পরিমাণ নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে তার প্রদত্ত করের অংশবিশেষ রিফান্ডেবল হবে। আয়কর অফিস থেকে রিফান্ড পাওয়ার অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা জানেন রিফান্ড নিতে কতটা বিড়ম্বনা করদাতাদের পোহাতে হয়।
বারভিডার সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, করবিভাগ করের আওতা না বাড়িয়ে, কর আদায়ে আধুনিক নীতি প্রয়োগ না করে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছেন—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দশ বছরের পুরোনো একটি গাড়ি যার বিক্রয়মূল্য ৪ লাখ টাকা, সেই গাড়ির মালিক কীভাবে এত টাকা আয়কর দিবেন। অনেকে উবার বা রেন্ট-এ-কার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা কীভাবে এত টাকা কর দেবেন—সে বিষয়টি বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে টিআইএনধারীরা একটা নির্দিষ্ট আয়কর দিয়ে থাকেন। আমার প্রস্তাব হবে সব টিআইএন সদস্য বাত্সরিক ২ হাজার টাকা দিবেন। রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তি তথা টিআইএনধারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
ব্যাংক ঋণের সুদহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুষ্টচক্রের মধ্যে আবদ্ধ ব্যাংকিং সেক্টর। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে বিনিয়োগে সর্বোচ্চ সুদহার ৪-৫ শতাংশ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শত প্রতিকূলতার পরও একক চেষ্টায় গত এপ্রিল মাস থেকে ৯ শতাংশ সুদহার করলেও ট্রাডিশনাল ও ইসলামী শরীয়াহর কিছু ব্যাংক সঠিকভাবে মানছে না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দরকার। ব্যাংকগুলো নানা অজুহাতে সিঙ্গেল ডিজিট সুদের হার কার্যকর করছে না। সরকার ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে বাড়তি সুদ আদায়ের জন্য তারা মরিয়া। তাহলে ব্যবসা সহজীকরণ কীভাবে হবে? এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি দরকার। তদুপরি প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ জনশক্তি নতুন করে শ্রমবাজারে আসছে। বর্তমান সুদহার কাঠামোতে ব্যবসায়ীরা যদি বিনিয়োগ না করে তাহলে এদের কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে বিবেচনার দাবি রাখে। সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণও তারা ছাড় করছে না। বিশেষ করে আমদানিকারক এবং ট্রেডাররা কোনোভাবেই এর সুযোগ পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার। ব্যাংকগুলো গাড়ি ক্রয়ে ঋণ প্রদান অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। তাহলে এই খাত টিকে থাকবে কীভাবে? তিনি বলেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে অন্যান্য খাতের মতো রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এ খাতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ঋণ সুবিধা বাড়ালে সরকারের রাজস্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন গাড়ির চেয়ে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্ককর বেশি হওয়ায় ক্রেতারা বিমুখ হচ্ছেন। ফলে ব্যবসায়ীরাও ব্যবসা হারাচ্ছেন। আর আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণের পরিমাণও সঙ্গত কারণে কমে যাচ্ছে। এইচ এন এস গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, বন্দরের ইয়ার্ডে ৮ হাজার গাড়ি রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে সম্পূর্ণ লকডাউন থাকায় যৌক্তিক কারণে এসব গাড়ি আটকা পড়ে। বারবার অনুরোধ করার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুই মাসের ভাড়া মওকুফ করছে না। মনে হচ্ছে প্রত্যেক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দরকার হয়ে পড়েছে। এভাবে কী প্রশাসন চলে?
সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে আপনি কী ভাবছেন? —প্রণোদনায় সরকারের ত্বরিত উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব এবং প্রজ্ঞা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। একটি দেশের মেরুদণ্ড হচ্ছে ছোট বড় সব ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়িক সংগঠন। মানুষের কর্মসংস্থান উন্নয়নে অন্যান্য দেশ যেভাবে ভাবছে, কীভাবে প্রণোদনা দিচ্ছে তা দেখতে হবে এবং করতে হবে। প্রণোদনার আকার বহুগুণে বাড়াতে হবে এবং বিস্তৃত করতে হবে। আমদানিকারক, ট্রেডার এবং সার্ভিস শিল্প যারা সমাজের ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থায় জড়িত তারা এখনো প্রণোদনার বাইরে।
আপনি বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রের কথা বলে থাকেন, বাজেট বাস্তবায়নে এটি কেমন ভূমিকা রাখবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র ধারণাটি নতুন নয়। এটি বেশিরভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে প্রচলিত রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মূল্যবান শিক্ষা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করার জন্য তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা ও কর্মজীবন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই খাতে বা একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখাই ‘বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রে’র মূল ধারণা। সব পেশায়ই এটি থাকা উচিত। উদাহরণ হিসেবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একজন আমলা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে জড়িত থাকতে পারেন না, কেননা তার এ বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই। কারণ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি একজন আমলা সুপারম্যান নন, তারও সীমাবদ্ধতা আছে। কেবল বিশেষায়িত আমলা যারা একই বিভাগে শুরু থেকে কাজ করে আসছেন তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে সক্ষম। বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র ধারণাটি আমাদের দেশে এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে না, এটা খুবই দুঃখজনক। বর্তমানে প্রায় সব মন্ত্রণালয়ে অব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষতার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এর বাস্তব উদাহরণ স্বাস্থ্যখাত। দুর্নীতি সর্বক্ষেত্রে প্রলয়ের মতো বিস্তৃত হচ্ছে। মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন, পরিবর্ধন তথা সংস্কার না করে শুধু রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করলে কোনো লাভ হবে না।
