আমাদের যা করণীয়

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ২১:৫৭

ডা. মো. আবদুর রহমান

করোনা চিকিত্সায় বিশ্বের ধনী দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। হাসপাতালে জায়গা নেই। আমাদের মতো জনবহুল দেশে সব করোনা রোগীর হাসপাতালে চিকিত্সা হবে—এ আশা করা মোটেও ঠিক নয়। একজন লোক আক্রান্ত হলে তার জন্য কী করণীয়, বাড়িতে রেখে কীভাবে চিকিত্সা প্রদান করা যায়, সেটাই এই লেখার মূল বিষয়। আমরা দেখেছি, সম্প্রতি টেস্টের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথা সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, এর কোনো বিকল্প নেই। যত বেশিসংখ্যক টেস্ট করা যাবে, তত বেশি সংক্রমিত ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যাবে এবং চিকিত্সা প্রদান করাও সহজ হবে। এতে আশপাশের লোকেরা শঙ্কামুক্ত হবে। এখন যে ব্যক্তিটি আক্রান্ত হলো তার বা তার পরিবারের জন্য আমাদের কী করণীয়। প্রথমত, আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিত্সা প্রদান ও পরিবারের লোকজনদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। ঘরে রেখে চিকিত্সা প্রদানের জন্য এখন উত্সাহিত করা হচ্ছে। এর প্রয়োজনও অনস্বীকার্য। কারণ, আমাদের দেশে টেস্টের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনা  রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাদের হাসপাতালে রেখে চিকিত্সা দিতে গেলে জায়গা সংকুলান হবে না। তাছাড়া করোনা আক্রান্ত প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ রোগীর উপসর্গ ততটা মারাত্মক হয় না। জ্বর, হাঁচি, কাশি ও গলাব্যথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই তারা বাড়িতে বসে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিত্সা নিয়ে ভালো হতে পারে।

জ্বর, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথার জন্য— ১. ট্যাবলেট প্যারাসিটামল একটা বা দুইটা করে দিনে চারবার খাবার পর জ্বর না ছাড়া পর্যন্ত। ২. ট্যাবলেট এজিথ্রমাইসিন প্রতিদিন একটা করে পাঁচ দিন। ৩. আর একটি ওষুধের কথা বলা হয়েছে— হাইড্রোকসি ক্লোরকুইন, এটা এখনো করোনা ভাইরাসের জন্য স্বীকৃত ওষুধ নয়, তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া যাবে না। কিছুটা সফলতা প্রমাণিত হলেও সার্বিক ব্যবহার এখনো আরম্ভ হয়নি। ৪. কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যে একজন চিকিত্সক করোনা চিকিত্সায় ডেক্সামেথাসনের কিছুটা সফলতার কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা এখনো প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া এই ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। প্রকৃত পক্ষে এই ওষুধটি অ্যাজমা এবং রিউমেটিক জ্বরে ব্যবহূত হয়। বেশি দিন ব্যবহারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক আলসার বাড়িয়ে দেয়। একমাত্র হাসপাতালে ভর্তি মুমূর্ষু রোগী ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না। ৫. কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, কেউ কেউ ট্রায়াল-সরূপ ব্যবহার করছে। এর সার্বিক সফলতা প্রমাণিত হলে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।

এছাড়া দেশ-বিদেশে ঘরোয়া চিকিত্সায় ভালো হয়ে যারা বেঁচে আছেন, তাদের লব্ধ জ্ঞান থেকে জানা যায়, লেবুর রস সহযোগে ঘণ্টায় ঘণ্টায় গরম পানি খাওয়া এবং গরম পানি গারগেল করে গলা পরিষ্কার রাখা। কারণ, ভাইরাস গলার মধ্যে বাসা বাঁধে। তারপর গলা থেকে ফুসফুসে গিয়ে ফুসফুসকে অকেজো করে দেয়। সে অবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্বাস নিতে না পারায় আক্রান্ত ব্যক্তিটি মারা যায়। তাই ঘন ঘন গরম পানি খেয়ে ও গারগেল করে যদি গলার ভেতর পরিষ্কার রাখা যায়, তাহলে ভাইরাস ফুসফুসে যেতে পারে না। হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে ঘরে বসে এই কাজগুলো করা সহজ। যাদের উপসর্গ মারাত্মক নয়, তাদের ঘরে রেখে চিকিত্সা দেয়া ভালো। আর যাদের উপসর্গ মারাত্মক, তাদের অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। কোভিড-১৯-এর ব্যাপারে একটা ইতিবাচক দিক হলো বিশ্বের প্রতিটি দেশ করোনার প্রারম্ভে যতটা ভয় পেয়েছিল, সেটা অনেকটা কেটে গেছে। তার কারণ, যত লোক করোনাতে আক্রান্ত হয়, তাদের ৬০-৭০ শতাংশের মধ্যে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না, ১৫-২০ শতাংশ লোক সামান্য চিকিত্সায় ভালো হয়ে যায়। বাকি ১০-১৫ শতাংশ লোকের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার হয় এবং তাদের একটা অংশের শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। যাদের ভেনটিলেটর বা আইসিইউ-এর দরকার হয়।

প্রয়োজনীয় টেস্ট হোক আর না-ই হোক, বুঝতে পারলে বা করোনা আক্রান্ত সন্দেহ হলেই পরিবারের অন্যান্য প্রিয়জনদের নিরাপত্তার জন্য নিজে নিজে আলাদা হয়ে যেতে হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ঘরেই সর্তকতার সঙ্গে চিকিত্সা নিতে হবে, কোনো অবস্থায় ভয় পেলে চলবে না। আতঙ্কিত বা ভীত হওয়া যাবে না। কারণ, মানুষ যখন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয় তখন এমনিতেই সে দুর্বল হয়ে যায়। তাই দৃঢ় মনোবল রেখে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হতে হবে। এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে, যাদের থাকার জায়গা নেই বা একটি  কক্ষে দুই-তিন জন ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস করে, একটি মাত্র বাথরুম অনেকে মিলে ব্যবহার করে, তাদের জন্য হাসপাতালে আইসোলেশন একান্ত প্রয়োজন। রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং পরিবারের অন্যদেরও প্রয়োজনীয়  সেবা-সহায়তা দিতে হবে । কোভিড-১৯ যদিও বৈশ্বিক ব্যাপার, তবুও আমাদের চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় চলে গেছে। সুচিন্তিতভাবে, সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বনে সর্বোপরি সবার সমন্বয়ের মাধ্যমে মহামারি মোকাবিলা করতে হবে।

n লেখক :সহসভাপতি, পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (PHAB)