কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ২১:৫৯

ড. মো. রোস্তম আলী

 

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য চাহিদা পূরণে সরকারের গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি একর জমিতে ফসলের উত্পাদন প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে।

ক্রমহ্রাসমান জমিতে ফসলের উত্পাদন বাড়ানো সহজসাধ্য নয়। কোনো একটি ফসল, যেমন ধানের উত্পাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত যাত্রাপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যাত্রাপথের একটি ধাপ, যেমন কর্তন, মাড়াই-ঝাড়াই, শুকানো, সংরক্ষণ এবং ধান ভাঙানোতে প্রচুর খাদ্যশস্য ক্ষতি হয়ে যায়। সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদের কারণে এই ক্ষতির হার আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কমিয়ে আনা সম্ভব। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদনপরবর্তী ফসলের ক্ষতির হার কমিয়ে এনে এসডিজি বাস্তবায়নে কৃষিপ্রকৌশলীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক ও উন্নত কৃষিব্যবস্থার জন্য কৃষিযান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। কৃষির ভবিষ্যত্ যান্ত্রিকীকরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরির লক্ষ্যে ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিপ্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ খোলা হয়। কৃষিপ্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্তদের অনেকেই বিএডিসি, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খাদ্য ও চিনি শিল্প, পল্লী বিদ্যুতায়ন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বিডব্লিউডিএ, সামিট, ওয়ারপো, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিনাসহ বেসরকারি কৃষিযন্ত্রপাতিসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। বিগত তিন-চার দশকে দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটায় কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। পাশাপাশি কৃষকগণ কৃষিকাজে যন্ত্রের সুবিধা অনুধাবন এবং সরকারিভাবে যন্ত্রের ব্যবহার উত্সাহিত করায় দেশ দ্রুত যান্ত্রিকীকরণের পথে অগ্রসর হচ্ছে।

সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদে বিপুল সংখ্যক লোকবল প্রয়োজন। উপরন্তু কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। শ্রমিকের এই ঘাটতি পূরণে কৃষিযান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। কৃষিপ্রকৌশলীগণ তাঁদের অর্জিত জ্ঞান মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগিয়ে যান্ত্রিকীকরণের কাজটিকে সহজ করে দিয়ে খাদ্য চাহিদা পূরণে অবদান রাখছেন।

সম্প্রতি কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিপ্রকৌশল ডিগ্রি প্রোগ্রামটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আধুনিকায়ন করেছে। এর অংশ হিসেবে সেন্সর ও রোবটিক্সভিত্তিক কৃষিযন্ত্র, কম্পিউটারচালিত (সিএনসি) খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির মেশিন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, জিআইএস-জিপিএস, প্রিসিশন এগ্রিকালচার, ড্রোনের ব্যবহার, খাদ্যমান বিশ্লেষণের জন্য ইমেজিং কৌশল, ত্রি-মাত্রিক ডিজাইনের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও আধুনিকায়ন, আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রিনহাউজ প্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চ মূল্যের ফসল চাষাবাদসহ অনেক আধুনিক বিষয় সংযুক্ত করেছে। এছাড়াও নতুন নতুন গবেষণা যেমন জিপিএসভিত্তিক কৃষিযন্ত্রের ট্র্যাকিং এবং কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণ, টেলিমেটিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র দূর থেকে নিরীক্ষণের ব্যবস্থা, ইমেজিং কৌশলের মাধ্যমে মাটির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ, পরিবহনের সময় মাছের সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বায়ুরোধী ধান সংরক্ষণ প্রযুক্তি, স্বল্প মূল্যের ধান শুকানোর যন্ত্র, জিআইএসএর মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে চিত্র, নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কৃষিযন্ত্রের প্রশিক্ষণ ও ব্যবসায়িক সম্ভাব্যতা শীর্ষক মডিউলসহ অনেক বিষয়বস্তুর ওপর গবেষণা কার্যক্রম চলমান এবং সারাদেশে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বিদ্যমান আছে।

বাংলাদেশ সরকারের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এবং বঙ্গোপসাগরে চর জেগে ওঠার কারণে যে জমি অধিগ্রহণ হবে তা চাষযোগ্য করে দেশের সকল চাষযোগ্য জমিতে আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক ফসল উত্পাদন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন কৃষিপ্রকৌশলীরা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনান্তে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কৃষিপ্রকৌশলীদের কাজের অধিক ক্ষেত্র সৃষ্টির মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়ণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে—এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

অধ্যাপক, কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগ,

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ