আমের অঞ্চল হিসেবে প্রসিদ্ধ রাজশাহী বিভাগের আম উত্পাদনকারীরা এ বছর প্রথম থেকেই বৈরী আবহাওয়ায় উত্পাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর করোনা পরিস্থিতিতে যানবাহনের অভাবে পাইকারি ক্রেতা না থাকায় আমের বাজারজাতকরণ নিয়েও যথেষ্ট চিন্তিত ছিলেন তারা। করোনাকালের লকডাউনের কারণে আম বিপণন নিয়েও দুশ্চিন্তায় ছিলেন আমচাষিরা। এর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে দেশের উত্পাদিত আমের প্রায় ১০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। আম্ফান ঝড়ে ক্ষতি পুষিয়ে আমচাষিদের মুখে এখন হাসি। আম বিপণনে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ায় কৃষকরা ক্ষতি কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পেছনে ফেলে এবার সবেচেয়ে বেশি আম উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে নওগাঁয়। এ জেলায় ২৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর আমবাগান থেকে এবার আম উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার ৫৩৯ টন। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩৩ হাজার ৩৫ হেক্টর আমবাগান থেকে এবার উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার টন। এছাড়া রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৬৮৬ হেক্টর বাগানে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৭ টন এবং নাটোরে ৪ হাজার ৮৬৪ হেক্টর বাগানে ৬৭ হাজার ২৮৪ টন আম উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলেছে, দেশের মোট আমবাগানের ১০ শতাংশ এবার ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাতক্ষীরাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আম উত্পাদনকারীরা বলছেন, ঝড়ে তাদের বাগানগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি আম ঝরে গেছে। এমনকি অনেক আমগাছ উপড়ে গেছে।
সরকারের যত উদ্যোগ
ঝড়ের তাণ্ডবে আম ঝরে পড়া আর আম বিপণন নিয়ে কৃষকের উদ্বেগের মুখে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে। আম বিপণনে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ায় কৃষকরা ক্ষতি কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে শুরু করে। তাছাড়া এবার অনলাইনেও আম বিক্রির নতুন পথ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এবছর করোনার কারণে আম বিক্রিতে আগের সেই স্বাভাবিক গতি কিছুটা কমে এসেছে।
আম বিপণনে রাজশাহী থেকে বিশেষ ট্রেন চলাচল করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ডাক বিভাগ বিনা মাশুলে আমসহ সব মৌসুমি ফল পরিবহন করছে। এছাড়া সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে আম দেশের সব জেলায় সহজেই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তিনি বলেন, যেসব জায়গা থেকে আম ও লিচু যাবে রাস্তায় কোনো ট্রাক যেন প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে, সেজন্য দৃষ্টি রাখা হয়েছে। সরকারের আটটি সংস্থা এ কাজে তদারকি করছে। ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের বললেই সেখানে চলে গিয়ে নিয়ে আসবে পণ্য। এর পাশাপাশি আম নিয়ে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার পর খালি ট্রাক ফিরে গেলে যমুনা সেতুতে টোল ৫০ ভাগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীদের খাদ্যে কলার পরিবর্তে আম দেওয়া, পুলিশ ব্যারাকে আমের বাজার গড়ে তোলা, সেনাবাহিনীতে আমের বাজার গড়ে তোলা ইত্যাদি ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে আমচাষিরা নায্যমূল্য পায়।
নওগাঁ জেলার সাপাহার থানা আম আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম জানান, আম ব্যবসায়ীরা যাতে নায্যমূল্য পান এবং রাস্তায় কোনো হয়রানি না করা হয় সেজন্য সরকারি দিকনির্দেশনা থাকায় পথে কোনো হয়রানির শিকার তারা হচ্ছেন না। ফলে আমের ব্যবসা সুষ্ঠুভাবে করতে পারছেন।
জেলার পোরশা থানা আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সামাদ শাহ চৌধুরী জানান, পোরশার সারাইগাছীতে আম কেনাবেচার হাট স্থাপন করায় উপজেলার শতশত লোক সহজেই আম কেনাবেচা করতে পারছেন। আগে সব আমচাষিদের সাপাহারে যেতে হতো।
বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হচ্ছে নওগাঁয়
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমবাগান রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তবে নওগাঁয় বাণিজ্যিকভাবে আমচাষ শুরু হওয়ায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমগাছ রোপণ করা হয়েছে। এই গাছ রোপণের ঘনত্ব বেশি থাকায় নওগাঁ জেলার আম উত্পাদন অন্য জেলাগুলোর চাইতে বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গড় আম উত্পাদন হয় ১২ লাখ টন। মোট উত্পাদনের অর্ধেকের বেশি আম আসে রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলো থেকে। মাটির বৈশিষ্ট্যগত কারণে নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে আমের ভরা মৌসুমে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও পাইকারি বাজার গড়ে না তোলায় আমচাষিরা ন্যায্যমূল্য পান না। জেলায় আগামী দিনে আরো অধিক আম উত্পাদন করার লক্ষ্যে আম গবেষণাকেন্দ্র, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নওগাঁ জেলায় গুটি, ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরশাপাত, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙা, আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১, নাগফজলি, গৌড়মতিসহ উন্নতজাতের আম চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া দেশীয় বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হয়ে থাকে। এসব আমের বিশেষ জাতের মধ্যে ‘নাগফজলি’ উল্লেখযোগ্য। এই নাগফজলি বিশেষ করে পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও মহাদেবপুরে চাষ হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, নওগাঁ এখন দেশের প্রধানতম আমের বাজার হয়ে উঠেছে। সেখানকার গাছগুলো নতুন। ফলে দীর্ঘকাল ধরে সেখানে উন্নতজাতের আম পাওয়া যাবে। ফলে পাইকার ও আড়তদাররা ব্যবসার জন্য নওগাঁ জেলার দিকে ঝুঁকছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক এ এফ এম গোলাম ফারুক হোসেন জানান, ধানের চেয়ে আম চাষে বেশি লাভ পাওয়ায় নওগাঁর ১১টি উপজেলায় শত শত বিঘা জমিতে উন্নত (হাইব্রিড) জাতের আমবাগান গড়ে উঠেছে।
মুনাফা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগীরা
রাজশাহী থেকে আনিসুজ্জামান জানান, জেলায় প্রতিদিনই বাড়ছে আমের দাম। ভরা মৌসুমে চাষি পর্যায়ে আমের দাম কম হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে স্বাদ নিতে পারছে না সাধারণ মানুষ। করোনার ওজর তুলে আকাশছোঁয়া আমের দাম হাঁকছে তারা। আগের মতোই আমচাষিদের থেকে কম দামে কিনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
পুঠিয়ার ভাল্লুকগাছির চকপাড়া গ্রামের আমচাষি হোসেন আলী জানান, নানা জটিলতায় বাগান থেকে আম পেড়ে সরাসরি হাটবাজারে বিক্রি করতে পারেন না তারা। প্রায় সবাই-ই বাগান থেকে আড়তদার ও শহর থেকে আসা ব্যবসায়ীদের কাছে আম বিক্রি করেন। এসময় তাদের থেকে কম দামে আম কিনে বাজার বেশি দামে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, প্রতিমণে (৪০ কেজি) তাদের ৬ কেজি আম বেশি (ঢলন) দিতে হয়। ফলে কৃষকের লাভ কম, মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভই বেশি।
পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজারের আম ব্যবসায়ী হায়াত আলী জানান, বর্তমানে বাজারে ক্ষীরশাপাতি (হিমসাগর) আম ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা মণ দামে বিক্রি হচ্ছে। শেষ পর্যায়ে বলে হিমসাগর আমের দাম একটু বেশিই। এছাড়া আজ ল্যাংড়া আম ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা মণ দামে বিক্রি হচ্ছে। আর কিছু আম্রপালি আম ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা মণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
রাজশাহীর হাটেমাঠে, পাড়ার গলিতে বিক্রি হচ্ছে আম। বাঁশের ঝুড়ি ও প্লাস্টিকের ক্যারেটে (খাঁচা) আমবাগান থেকে সরাসরি বাজারে যাচ্ছে। আম বাণিজ্যে পালটে গেছে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর অঞ্চলের অর্থনীতি। প্রতিদিন বেচাকেনা হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার আম। পুঠিয়ার বানেশ্বর ও শিবগঞ্জের কানসাট এখন আম কেনাবেচায় জমজমাট। এ অঞ্চলে লাখো মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়েছে আম কেনাবেচায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি শেষের পথে। চলতি সপ্তাহে বাজার দখলে নিয়েছে ল্যাংড়া। আগামী সপ্তাহেই উঠবে আম্রপালি ও ফজলি।
