দেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন নতুন হাসপাতাল গড়ে উঠলেও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। হাসপাতালগুলোতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, ভবন, আইসিইউ, সিসিইউ সব থাকলেও দক্ষ জনবলের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা।
বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ৩০ হাজার ডাক্তার, ৪১ হাজার নার্স ও সাড়ে ৫ হাজার টেকনোলজিস্ট কর্মরত রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, এক জন ডাক্তারের বিপরীতে তিন জন নার্স ও পাঁচ জন টেকনোলজিস্ট থাকতে হয়। ঐ হিসাবে সরকারি পর্যায়েই প্রয়োজন ৯০ হাজার নার্স ও দেড় লাখ টেকনোলজিস্ট। দেশে বর্তমানে ৩০ হাজার ডাক্তার, প্রায় ২২ হাজার নার্স ও ৩০ হাজার টেকনোলজিস্ট বেকার রয়েছেন।
এদিকে দেশে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের দক্ষ জনবল সংকটের চিত্র দিনদিন আরো প্রকাশ্য হচ্ছে। করোনা ব্যবস্থাপনা সামাল দিতে গিয়ে ডায়াবেটিস, কিডনি, হার্ট, ক্যানসারের রোগীসহ লাখ লাখ অসংক্রামক রোগী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। করোনা চিকিৎসায় যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে সেজন্যও দক্ষ জনবল সংকটই মূল কারণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ ও নতুন পদ সৃষ্টির জন্য প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।’ জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রস্তাব পাঠালে মন্ত্রণালয় তেমন গুরুত্ব দেয় না। আবার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতেই বছর পার হয়ে যায়। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা কেনাকাটায় ব্যস্ত। এতে অর্থ লুটের সুযোগ থাকে।
বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে বড় বড় অবকাঠামো আছে, মেশিনও অত্যাধুনিক, কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। টেকনোলজিস্টের কাজ আয়া ও ওয়ার্ড বয় দিয়ে হবে না। ডাক্তারের কাজ নার্স দিয়ে হবে না। আর মেশিন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। অদক্ষ জনবলের কারণে অত্যাধুনিক মেশিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার কাজ তাকে করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে ডাক্তার ও নার্সের গুণগত মান ভালো হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। এ দেশের চিকিত্সক-নার্সদের সেবার মান বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় খারাপ নয় বরং কোনো কোনো বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানেরও রয়েছে। দেশ-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রিধারী কয়েক হাজার নার্সও রয়েছেন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পদ না থাকায় তাদের পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া এ দেশে আন্তর্জাতিকমানের বেশ কিছু চিকিত্সকও রয়েছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাদের সুনাম রয়েছে। অনেক কঠিন ও জটিল রোগের চিকিত্সা ও অপারেশন এখানে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার নজিরও রয়েছে। এমনকি বিদেশে যে অপারেশন করা সম্ভব হয়নি ফেরত পাঠিয়েছে, সেটাও এখানে করা হয়েছে। যেমন জোড়া শিশু তোফা-তহুরা। এ দেশেই তাদের সফল অপারেশনের মাধ্যমে আলাদা করা হয়েছে।
তবে দক্ষ জনবলের অভাবে স্বাস্থ্যসেবায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে অনেক দামি ও দরকারি যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে, অনেক দিন পর্যন্ত সেগুলো আলোর মুখই দেখতে পায় না। আবার অনেক জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে এমন অত্যাধুনিক মেশিন পাঠানো হয়, যা চালানোর মতো দক্ষ জনবল তাদের নেই। ফলে সরকারি তহবিলের অপচয় ছাড়া আর কিছু হয় না।
কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালে ২১ শতাংশ চিকিৎসা যন্ত্রপাতির প্যাকেটই খোলা হয় না। ১১ শতাংশ ব্যবহারের আগেই নষ্ট হয়ে যায়, ১১ শতাংশ যন্ত্রপাতি ঠিক থাকলেও ব্যবহারই করা হয় না, ১০ শতাংশের ব্যবহার হয় আংশিক। বাকি থাকল ৪৭ শতাংশ।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ৮০০ বেড থেকে ২ হাজার ৬০০ বেডে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু ৮০০ বেডের জনবল দিয়েই চলছে হাসপাতালটি। সারাদেশে জেলা সদর হাসপাতাল ১০০ বেড থেকে বাড়িয়ে ২০০ বেডের করা হয়েছে। কিন্তু জনবল বাড়ানো হয়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ বেড থেকে ৫০ বেডে উন্নীত হলেও জনবল বাড়েনি।
এদিকে দেশে ৬১০টি সরকারি হাসপাতালের জন্য মাত্র ১৯ জন চিকিত্সাযন্ত্র প্রকৌশলী কাজ করছেন। এর মধ্যে ৯ জন বিএসসি প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমাধারী রয়েছেন ১০ জন। অথচ ডিপ্লোমাধারী ইলেকট্রো মেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিএসসি) সম্পন্ন করে বেকার রয়েছেন কয়েক হাজার যন্ত্র প্রকৌশলী। চিকিৎসাযন্ত্র প্রকৌশলীর কাজ হাসপাতালের নষ্ট হওয়া যন্ত্রপাতি মেরামত করা।
পর্যাপ্ত প্রকৌশলী না থাকায় রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। ফলে সময়মতো মেরামত করতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের অতি প্রয়োজনীয় কোটি কোটি টাকার চিকিত্সা সরঞ্জাম। এতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সনদ থাকার পরও হাসপাতালে পদ ও নিয়োগ না থাকায় বেকার জীবনযাপন করছেন অসংখ্য চিকিৎসাযন্ত্র প্রকৌশলী।
