শওকত বাস থেকে প্রেসক্লাবে নামে। আজ শুক্রবার। তাড়া নেই কোনো। রিক্সায় উঠে পয়সা খরচ না করলে বরং যাবার সময় এক ডজন কলা নিতে পারবে। আসার সময় ছেলেটা কলার কথা বলে দিয়েছে। বড় বড় সাগর কলা। ওর মা যতই বলে চাঁপাকলা ভালো, ও বলে সাগরকলা। বাচ্চা তো, বড় জিনিসে আসক্তি। ছোটবেলায় শওকতেরও ছিল। তাই রান্না হবার সাথে সাথে পাটি পেতে খেতে বসে যেত যাতে বড় ডিমটা, বড় মাছের টুকরোটা কেউ নিতে না পারে।
শিশু একাডেমির দিকে হাঁটতে থাকে। ফুলের চারা কিনবে। ওখানে দেশি-বিদেশি অনেক ফুলের চারা, এমনকি ফুলফোটা গাছও পাওয়া যায়। আজ ও এসেছে একটা কাঠগোলাপের কলম কিনতে। বাসার সবচেয়ে বড় সাইজের বালতিটা ফেটে গেছে। বালতি ফাটাতে হায় হায় করে উঠেছে কাজল। ‘এখন কী হবে। এ বালতির যে এখন অনেক দাম!’
শওকতের মন খারাপ হতে গিয়ে দ্বিগুণ ভালো হয়ে যায়। এতবড় টব পাওয়া যায় না। ড্রাম কিনতে অনেক ঝক্কি। বালতির চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কী হতে পারে। তখনই মনে মনে ঠিক করে ফেলে, গোবরমাটি কিনে বালতি বোঝাই করে বারান্দার এককোণে যে জায়গাটাতে একফালি রোদ আসে, সেখানে কাঠগোলাপ লাগাবে। সেই কাঠগোলাপ নিতেই আজ আসা।
ওর গাছপালা কেনা খুবই অপছন্দ কাজলের। কথায় কথায় বলে, এটা ওর বিলাসিতা। আর কোনো বিলাসিতা নেই শওকতের, এই একটাই। না ভালো জামা-কাপড়, না খাওয়া-দাওয়া, তাতেও আপত্তি। এ কথার পর থেমে গেছে কাজল। বরং ছেলে দিসামকে বলেছে, ‘বাবার গাছগুলো একটু যত্ন করিস তো। পানি দিস। খাটাখাটুনি করে আসার পর গাছে পানি দেয়। আমি তো সংসারের কাজ সামলে পারিনে।’
দিসাম বড় ভালো ছেলে। বাবার গাছের যত্ন করে। গাছে ফুল ধরলে মুগ্ধ চোখে দেখে। বাবাকে টেনে নিয়ে যায় দেখাতে। সেদিন খুব ভালো লাগে শওকতের। মনে হয়, ওর মতো সুখীবাবা, সুখী মালি আর কে আছে!
ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে এসবই ভাবে শওকত। হাইকোর্ট পেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে শিশু একাডেমির ওপারে চলে আসে। একাডেমির সামনে মাটির জিনিসপত্র, কুটিরশিল্পের জিনিস বিক্রি হচ্ছে। মহিলারা বসে পুঁতির মালা গাঁথছে।
শওকত গাছের অরণ্যে ঢুকে পড়ে। ও চায় হলুদাভ রঙের কাঠগোলাপ কিনতে। ওর ইচ্ছে ফুলধরা গাছ নেয়ার। যাতে না ঠকে। কাঠগোলাপ তো অনেক রঙের হয়, সাদা, গোলাপি। ও হলুদাভটাই চায়। কেমন সোনা ছড়ানো ছড়ানো লাগবে ফুলফোটা বারান্দাটা। ভাবতেই ওর ভালো লাগে।
ফুলধরা গাছ পাচ্ছে না শওকত। এ দোকান ও দোকান ঘুরছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ঠেলাওয়ালা। ঠেলায় জামা প্যান্ট গেঞ্জি টি-শার্ট আরও অনেক কিছু। শওকতের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত আর প্রান্তিক মানুষেরা এগুলো কেনে। ও একবার তাকিয়ে অন্য দোকানে ঢোকে। না পেয়ে বের হয়। তখন ওর চোখ পড়ে একটা বাচ্চা ঠেলার পাশে দাঁড়িয়ে দুটো টি-শার্ট তুলে দোকানদারকে দাম জিজ্ঞাসা করছে। দোকানদার দাম বলতেই ওর মুখটা কালো হয়ে গেল। ও আস্তে টি-শার্ট দুটো ছেড়ে দিলো ঠেলায়। শওকত আরেক দোকানে ঢুকল। পেলো না। বেরোনোর সময় দেখল বাচ্চাটা সেই টি-শার্ট দুটো হাতে ধরে করুণ চোখে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কিনছে, কেউ চলে যাচ্ছে। শওকত আর একটা দোকানে ঢুকল। এখানে কাঠগোলাপ আছে। দোকানি গ্যারান্টি দিলো এটাতে হলুদাভ ফুল ফুটবেই। শওকত আগে একবার বাগানবিলাস কিনে ঠকেছে। হলুদ বলে ওকে লাল দিয়ে দিয়েছে। ও বেরিয়ে আসে, শেষ দোকানটার দিকে হাঁটছে। বেশ দূর থেকে চোখে পড়ে হলুদাভ ফোটাফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরূপা কাঠগোলাপ। ও দ্রুত হাঁটে, যাক পেয়েছি শেষাবধি। হঠাত্ কর্কশকণ্ঠ কানে আসে—
: যা ভাগ, কিনার সাধ্যি নেই সাধ কত। হাতে নিয়ে কচলে কচলে ময়লা করে ফেললি।
বাচ্চাটার হাত থেকে খসে পড়ল টি-শার্ট। ও পিছু হটছে। ফুটপাতে নেমে এল শওকত। বাচ্চাটার হাত ধরে বলল—
: দাঁড়াও
টি-শার্ট নিয়ে বাচ্চাটার হাতে দিয়ে বলল, এ দুটো তোমার।
বাচ্চাটা একবারও শওকতের দিকে তাকাল না, ধন্যবাদ বলল না। টি-শার্ট বুকে চেপে ধরে ছুটতে লাগল। যা ও পেয়েছে তা যেন হারিয়ে না যায়, তা যেন মিথ্যে হয়ে না যায় তাই এই ছোটা!
শওকত তাকিয়ে দেখে। পয়সা মিটায়। কাঠগোলাপ কেনার পয়সা নেই, পয়সা নেই কলা কেনারও। তাতে কী। সে আজ অফুরান আনন্দ কিনেছে।
অলঙ্করণ :সোহেল আশরাফ
